বাংলা রচনা

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রচনা | এসএসসি – এইচএসসি

4.8/5 - (49 votes)

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রচনা

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা তোমরা অনেকেই জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রচনাটির জন্য অনুরোধ করেছিলে। তাই বিভিন্ন বই থেকে পয়েন্ট সংগ্রহ করে সহজ ভাষায় সকল শ্রেণীর উপযোগী করে রচনাটি লেখা হয়েছে। আশা করি তোমাদের উপকারে আসবে।

Table of Contents

[button color=”red” size=”big” link=”https://www.hazabarolo.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b0%e0%a6%9a%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a7/” icon=”” target=”true” nofollow=”false”] সকল রচনা একসাথে[/button]

ভূমিকা

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে উপনীত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে সর্বপ্রথম আসে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। পরিবেশ মানব সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সভ্যতার ক্রমবিকাশ থেকেই মানুষ ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছে তার পরিবেশ। মানুষের রচিত পরিবেশ তারই সভ্যতার বিবর্তন ফসল।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কী

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হলো তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট কম সময়ে মানুষের কার্যক্রমের ফলে পৃথিবীর জলবায়ুর গড় তাপমাত্রার একটা লক্ষণীয় বৃদ্ধি । আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলা যায়, একশ থেকে দুইশ বছরের মধ্যে বিশ্বের জলবায়ুর উষ্ণতা ১ ডিগ্রি বা এর চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেলে এটাকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলা যেতে পারে। একশ বছরের মধ্যে ০.৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়লেও সেটা উল্লেখযোগ্য ।

আবহাওয়া ও জলবায়ুর ধারণা

কোনো নির্দিষ্ট এলাকার তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, ভূ-প্রকৃতি অন্যান্য এলাকা থেকে ভিন্ন হয়। এরূপ হওয়ার কারণ হলো আবহাওয়া ও জলবায়ুর তারতম্য। কোনো একটি অঞ্চলের স্বল্পকালীন সময়ের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ ইত্যাদি হলো আবহাওয়া। অন্যদিকে আবহাওয়ার দীর্ঘকালীন গড় অবস্থা (সাধারণত ২৫-৩০ বছর) হলো জলবায়ু ।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তন

বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ুর পরিবর্তন : পৃথিবীকে বেষ্টন করে রাখা বায়ুমণ্ডলো তথা আবহাওয়ামণ্ডলের উপযুক্ততায় পৃথিবীতে প্রাণধারণ করা সম্ভব হয়েছে এবং পৃথিবী হয়েছে বাসযোগ্য । মহাশূন্যে ওজোন স্তর নামে অদৃশ্য এক দেয়াল বিদ্যমান। এটি পৃথিবীতে সূর্যের ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মি প্রবেশে বাধা দেয়। ওজোন স্তরে পরিশোধিত হয়ে সূর্যের উপকারী তাপ ও আলোই কেবল পৃথিবীতে আসতে পারে। কিন্তু মানবসৃষ্ট দূষণ, বনাঞ্চল ধ্বংস এবং অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে এই স্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ফ্রিজ, এসি ইত্যাদিতে ব্যবহৃত CFC গ্যাস ওজোন স্তরকে ছিদ্র করে দিচ্ছে। ফলে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি সহজেই পৃথিবীতে প্রবেশ করছে। এতে পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। আবার মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমনের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বনের একটি দেয়াল বা স্তর সৃষ্টি হচ্ছে। এই স্তর পৃথিবী থেকে বিকিরিত তাপ মহাশূন্যে ফেরত যেতে বাধা দিচ্ছে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। এই প্রক্রিয়াকে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া বলা হয়। এভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ।

প্রতিনিয়ত পৃথিবীর তাপমাত্রা অধিকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জলবায়ুর স্বাভাবিক চরিত্রে পরিবর্তন ঘটছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত বিষয়টি ‘বিশ্ব বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন’ অভিধায় ভূষিত। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি। আর বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ হল গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রতিক্রিয়া। সাধারণত সূর্য থেকে যে তাপশক্তি পৃথিবীপৃষ্ঠে আসে তার কিছু অংশ পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে এবং অধিকাংশ বিকরিত হয়ে পুনরায় বায়ুমণ্ডলে চলে যায়। কিন্তু বায়ুমণ্ডলে ব্যাপক পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন প্রভৃতি গ্যাস জমা হওয়ার ফলে ভূপৃষ্ঠের তাপ বিকিরণ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং এসব গ্যাস তাপ শোষণ করে। ফলে দেখা যায় ক্রমাগত ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ উত্তপ্ত হচ্ছে। গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার জন্য দায়ী গ্যাসগুরোর মধ্যে অন্যতম হল কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন এবং নাইট্রোজেন ও সালফার অক্সাইডসমূহ।

[box type=”info” align=”” class=”” width=””]একটু জানোঃ

[tie_list type=”lightbulb”]

  • কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন এবং নাইট্রোজেন ও সালফার অক্সাইড গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার জন্য দায়ী।

[/tie_list]

[/box]

আইপিসিসি চতুর্থ প্রতিবেদন (২০০৭)-এ বর্ণিত হয়ছে যে গত শতাব্দীতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ২৫%, নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ ১৯% এবং মিথেনের পরিমাণ ১০০% বেড়েছে। এই লক্ষণগুলো সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করলে পৃথিবীর বাসযোগ্য পরিস্থিতি মানসলোকে ভীতিকর হয়ে ওঠে। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাস সূর্যরশ্মির তাপ আটকে রেখে পৃথিবীকে উষ্ণ রাখে। এ ধরনের গ্যাসসমূহকেই গ্রিনহাউস গ্যাস বলে। পাশ্চাত্যের শিল্পায়িত সমাজে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস, অক্সাইড, মিথেন ইত্যাদি গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ মারাত্মকভাবে বাড়তে থাকার কারণে পৃথিবী ক্রমশ উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়েছে। এরই ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন হয়েছে। এ অবস্থা মানুষের সৃষ্টি, বিশেষত ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো এর জন্য দায়ী। যে কোনো দেশের অর্থনীতি ও সমাজের ওপর এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এ বিষয়টি দিনকে দিন অর্থনীতি, রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ছাপিয়ে সামাজিক আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তন তথা বিশ্ব উষ্ণায়নের একটি সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায়-

প্রথমত, ভূপ্রষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির উত্তাপ বৃদ্ধি পাবে এবং পানি সম্প্রসারিত হয়ে সমুদ্রের আয়তন ও পরিধিকে বাড়িয়ে তুলবে।

দ্বিতীয়ত, উষ্ণায়নের ফলে পর্বতচূড়ায় জমে থাকা বরফ গলে সমুদ্রের পানির পরিমাণ বাড়াবে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাবিত এলাকার পরিমাণ যেমন বাড়বে তেমনি পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে বড় বড় শহর।

তৃতীয়ত, উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে গ্রিনল্যান্ড, অ্যান্টার্কটিকাসহ অন্যান্য ভূভাগের উপরিতলে জমা হওয়া বরফ গলে সমুদ্রে এসে মিশে যাবে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে।

সর্বোপরি, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিহেতু ভূপৃষ্ঠের অনেক পরিবর্তন দেখা দেবে। Intergovernmental Panel of a Climate Change (IPCC)-এর সমীক্ষায় বলা হয়, বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে পরবর্তী প্রতি দশকে ৩.৫ থেকে ১৫ মিলিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এমনকী ২১০০ সাল নাগাদ তা ৩০ সেন্টিমিটার থেকে ১০০ সেন্টিমিটারে পৌঁছতে পারে।

জলবায়ুর পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বন্যা, খরা, নদীপ্রবাহের ক্ষীণতা, পানিতে লবণাক্ততা, সাইক্লোন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙনসহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জনবিপর্যয় ঘটবে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যেই এশিয়াসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এশিয়া মহাদেশের ১৩০ কোটি অধিবাসী হিমালয় পর্বতমালার হিমবাহগুলো থেকে সৃষ্ট পানির উৎসের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হিমবাহগুলো আশঙ্কাজনকহারে গলে যাচ্ছে এবং এতে মহাদেশের একটি বিশাল অংশ খরায় আক্রান্ত হতে পারে। এই অঞ্চলে তিন দশক ধরে প্রতি দশকে ০.১৫ থেকে ০.৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেড়েছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তসরকার প্যানেল (আইসিপিপি) সতর্ক করে জানিয়েছেন, ২০৩৫ সালের মধ্যেই হিমালয়ের সব হিমবাহ গলে যেতে পারে।

এশিয়ার কয়েকটি দেশ জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে তাদের কেমন ক্ষতি হতে পারে তা প্রতিভাত করার লক্ষ্যে নানান ধরনের প্রদর্শনী ও উৎকণ্ঠা প্রকাশের কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। মালদ্বীপের সরকার ২০০৯ সালে সমূদ্র তলদেশে সভা করেছেন এবং মালদ্বীপ নামক একটি রাষ্ট্র জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে, এই সম্ভাবনাকে বিশ্ববাসীর কাছে পুনরায় তুলে ধরেছেন। তেমনিভাবে নেপালের প্রধানমন্ত্রী এভারেস্ট-এর পাদদেশে প্রচণ্ড শীতের মাঝে মন্ত্রী পরিষদের সভা করে জলবায়ুর ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ইন্দোনেশিয়া, ফিজি, মরিসাস-এর মতো দ্বীপ রাষ্ট্রসমূহ তাদের বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে পানির মাত্রা বৃদ্ধির ফলে তাদের অবস্থান নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

কোপেনহেগেন সম্মেলন ২০০৯-এ বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মসূচি বাবদ ৭০,০০০ কোটি টাকার সহযোগিতা চেয়ে প্রকল্প বা কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন।

জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা

জলবায়ুর পরিবর্তন এবং এর অভিঘাতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিশ্বজুড়ে বিশেষত সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলোর আতঙ্কের শেষ নেই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিপন্নতার মাত্রা খুবই বেশি। বিশাল জনগোষ্ঠী, তিলে তিলে গড়ে তোলা ভৌত অবকাঠামো আর অর্থনীতির প্রাণশক্তি কৃষি- এ তিনটি ক্ষেত্রের বিপন্নতা দেশের সার্বিক ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

(১) জনগোষ্ঠী ও প্লাবন : বর্তমান বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থার প্রেক্ষিতে কোনো মাঝারি প্লাবনে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ ভাগ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে বন্যার তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাবে। আইপিসিসি-এর সমীক্ষা অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্লাবনজনিত কারণে বস্তুগত সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ হবে ৫৪২ বিলিয়ন টাকা।

[box type=”note” align=”” class=”” width=””]আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের নিসর্গে ষড়ঋতুর প্রভাব – রচনা[/box]


(২) খরায় জনগোষ্ঠী ও কৃষির ক্ষয়ক্ষতি : বাংলাদেশে বর্তমানে শীত মৌসুমে প্রায় ৩৬০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা খরার কবলে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খরার ব্যাপ্তি আরো বাড়বে এবং খরাকবলিত এলাকা ভবিষ্যতে ২২০০০ বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। তাছাড়া আমন মৌসুমে খরার প্রকোপ বাড়লে মাঝারি ধরনের খরাকবলিত এলাকা চরম খরাকবলিত এলাকায় পরিণত হবে। তখন খরাকবলিত এলাকা বর্তমানের তুলনায় চার গুণ বেড়ে যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশের ১০ কোটি ৩০ লাখ লোক খরাকবলিত এলাকায় বসবাস করে, যা মোট জনসংখ্যার ৫৭%। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে খরার প্রকোপ ও ক্ষয়ক্ষতির থেকেও আমাদের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাব্য পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ। গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বর্ষা মৌসুমের ফসলের ওপর খরার প্রতিকূল প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনে দেশের মধ্য-দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গমের আবাদ অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং আলুর চাষও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে। প্রয়োজনীয় সেচের অভাবে উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের চাষাবাদ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে।

(৩) আকস্মিক বন্যা ও জনগোষ্ঠী : আইপিসিসি-এর সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে দেশে অতিবৃষ্টি দেখা দেবে এবং এতে নদীপ্রবাহের পরিবর্তন হয়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাহাড়ি ঢলের কারণে ঘন ঘন আকস্মিক বন্যা দেখা দেবে। এ অঞ্চলে বর্তমানে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস। আকস্মিক বন্যায় এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতির প্রবণতাও বৃদ্ধি পাবে। ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে দেশের প্রায় ১০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং ১২ লক্ষ লোক ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে নদীভাঙনের প্রকৃতি ও পরিধি বাড়বে, যা দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতির হারও বাড়িয়ে দেবে।


(৪) জলবায়ুর পরিবর্তন ও পরিবেশীয় রীতি : জলবায়ুর পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি দেশের পরিবেশীয় রীতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে। এমনিতেই দেশে জনসংখ্যার তুলনায় প্রাকৃতিক সম্পদ অপ্রতুল। জলবায়ুর পরিবর্তন হলে সম্পদের অপ্রাপ্যতা আরও বাড়বে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য দ্রুত বিনষ্ট হবে। ইতোমধ্যেই দেশের বৃহৎ বনভূমি সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলের পরিবেশীয় রীতি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। আইপিসিসি-এর এক সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছে, প্রতি দুই সেন্টিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে উপকূলীয় তটরেখা গড়ে ২-৩ মিটার স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হলে ২০৩০ সাল নাগাদ মূল ভূখণ্ডের ৮০-১২০ মিটার পর্যন্ত অতিক্রম করবে এবং কালক্রমে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

[box type=”info” align=”” class=”” width=””]একটু জানোঃ[tie_list type=”lightbulb”]

  • কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতঃ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত একটি সৈকত। ১২০ কিলোমিটার (৭৫ মাইল) দীর্ঘ এই সৈকত পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতটি পৃথিবীর দীর্ঘতম অখন্ডিত সমুদ্র সৈকত। এ সমুদ্র সৈকতের বৈশিষ্ট্য হলো পুরো সমুদ্র সৈকতটি বালুকাময়, কাদার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

[/tie_list][/box]


(৫) লোনা পানির অনুপ্রবেশে জনগোষ্ঠী ও কৃষির বিপন্নতা : বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ বসবাস করে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে। আইপিসিসি -এর সমীক্ষানুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১০০ সেমি বৃদ্ধি পেলে ২৫০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় লোনা পানির অনুপ্রবেশ ঘটবে। ফলে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ লোকের জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


(৬) জনস্বাস্থ্যের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব : বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি প্রকৃতি বিবর্তনের কারণে ঘনবসতিপূর্ণ ও বৃহৎ উপকূলীয় অঞ্চল অধ্যুষিত দেশসমূহের জনগণের স্বাস্থ্যরক্ষা ও জীবনযাত্রায় হতাশাজনক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়, প্লাবন, ভূমিধস, তীব্র খরা জনগণের স্বাস্থ্য ও সম্পদসহ সকল অর্জনকে মুহূর্তের মধ্যেই বিলীন করে তাদেরকে রোগাক্রান্ত হতাশাগ্রস্ত শরনার্থীতে পরিণত করতে পারে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অর্জন বিলীন করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন বাংলার মানুষের জীবনে যে ভয়াবহ দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে তা হচ্ছে জনস্বাস্থ্য রক্ষার বিপর্যয়। মা ও শিশু স্বাস্থ্যের চরম অবনতি, সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব, শ্বাসকষ্ট, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যাতিক্রম, হৃদযন্ত্রের রোগ, সর্দি-কাশি, জ্বর, যক্ষা, চর্মরোগ, মানসিক ভারসাম্যহীনতার ব্যাপক ব্যাক্তি। এছাড়া আছে জলবাহিত রোগ, যেমন : কলেরা, যকৃতের ব্যাধি, ডাইরিয়ার প্রসার। তদুপরি, পতঙ্গবাহিত রোগ, যেমন : ডেঙ্গু। বার বার ঘুরে আসা রোগসমূহ জনস্বাস্থ্য, প্রজনন সাস্থ্যকে মুহূর্তে তছনছ করে দিচ্ছে এ জলবায়ুর পরিবর্তন।

জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ

দেশে গত ছয় বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সে হিসাবে বছরে গড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর ৪০ ভাগ ক্ষতিই হয়েছে কৃষি খাতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের ‘বাংলাদেশ ডিজাস্টার রিলেটেড স্ট্যাটিস্টিক (বিডিআরএস): ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ন্যাচারাল ডিজাস্টার প্রেসপেকটিভ’ জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে বিবিএস। ১১ ধরনের দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের ৬৪ জেলার দুর্যোগপ্রবণ এলাকা থেকে জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে দেখা যায়, ছয় বছরে বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা ধরনের দুর্যোগের ক্ষতিতে পড়ে তিন কোটি ৪১ লাখ ১২ হাজারের মতো মানুষ। এর আগের জরিপে এ সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২০ লাখ ৪ হাজার জন। জরিপে দেখা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত ২০১৫-২০২০ সালে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ৭৯ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাতে ক্ষতি হয় ৭১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা।

শেরপুরে বন্যায় প্লাবিত অঞ্চলের একটি ছবি
শেরপুরে বন্যায় প্লাবিত অঞ্চলের একটি ছবি

জীববৈচিত্রে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব

সময়ের ধারাবাহিকতায় বদলে যাচ্ছে পরিবেশ। প্রকৃতির গতিপ্রকৃতি পাল্টে যাওয়ায় জনজীবনে এসেছে পরিবর্তন। প্রতিনিয়ত মানুষের জীবন ধারণের প্রয়োজন যেন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে মানুষকে। এখন আর প্রকৃতির ওপর ভর করতে পারছে না জীবন, বরং প্রাকৃতিক বিপর্যয় জীবনযাত্রাকে টেনে নিচ্ছে সংগ্রামের পথে। বিস্তীর্ণ জনপদ কখনো প্লাবনে ডুবে যায়, কখনো ঝড় ও বন্যায় ভেসে যায় মানুষজন, গবাদিপশুসহ সহায় সম্পদ। বছরের পর বছর নদীভাঙনে নিঃস্ব হয় হাজার হাজার মানুষ। প্রকৃতির এই বৈরী আচরণে জীববৈচিত্র্যের ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। এইসব পরিবর্তনের জন্য বিশেষজ্ঞরা বৈশ্বিক উষ্ণতাকে দায়ী করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশেষ করে বাংলাদেশের উপকূলের চেহারা বদলে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত সেখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা এক কঠিন বাস্তবতায় ঘুরপাক খাচ্ছে। টিকে থাকতে হচ্ছে সংগ্রাম করে। উপকূলের দীর্ঘ এলাকায় প্রতি বছর দুর্যোগে হাজারো মানুষের প্রাণ যায়। কোটি কোটি টাকার সম্পদহানি ঘটে। সময়ের ধারাবাহিকতায় পরিবেশ উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়া পরিবারগুলো ভাসমান দিন কাটায়। তাদের দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে। সময়ের বিবর্তনে উপকূল অঞ্চলের জীবনধারায় এসেছে নানা পরিবর্তন। পেশা বদলে গেছে। বছরের পর বছর মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী পরিবারগুলো এখন ফিরছে অন্য পেশায়। কেউ কেউ পাড়ি জমিয়েছে শহরের পথে।

কৃষকরা আর চাষাবাদ করে বেঁচে থাকতে পারছে না। তারা হারাতে বসেছে বাপ-দাদার পুরনো ঐতিহ্য হাল-চাষ। উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উৎপাদক শ্রেণির এসব মানুষ। প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ কমে যাচ্ছে, দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংঙ্কট। এরইমধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ভয়াবহতার ঈঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে উপকূল এলাকার মানুষের জীবন জীবিকার ধরন। প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের ওপর। প্রকৃতির রুদ্ররূপ সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিলীন করে দিচ্ছে।

[box type=”info” align=”” class=”” width=””]একটু জানোঃ [tie_list type=”lightbulb”]

  • সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলির অন্যতম। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। সুন্দরবন ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। (বিস্তারিত)

[/tie_list][/box]

প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, অকাল বৃষ্টি মারাত্মক প্রভাব ফেলছে সব ধরনের পেশায়। মৌসুম কখনও এগিয়ে আসছে আবার কখনও পিছিয়ে যাচ্ছে। দেশের উপকূলের ১৯ জেলার প্রায় ৪ কোটি মানুষ রয়েছে। যা দেশের মোট আয়তনের শতকরা ৩২ ভাগ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকার প্রকৃতির মতিগতি দ্রুতই বদলে যাচ্ছে। মানুষের বেঁচে থাকার সুযোগগুলো দিনদিন সঙ্কুচিত হচ্ছে। প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল গরিব মানুষের দুঃখ ও দারিদ্র্য দুইই বাড়ছে। এ-সবই যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হচ্ছে তা সাধারণ মানুষ এখনো বুঝে উঠতে পারছে না। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে দেশের উপকূল অঞ্চল, হাওর অঞ্চল এবং চরাঞ্চলে যে প্রভাব ফেলছে তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেয়া হল :

(১) জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার প্রভাব বেড়েছে। (২) ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নিম্নচাপসহ দুর্যোগ প্রবণতা বেড়েছে। (৩) মিঠা পানির স্রোত কমেছে। (৪) খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটেছে। (৫) চিংড়ি ঘেরের বিস্তার ঘটেছে, অপরিকল্পিত বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। (৬) ধানের উৎপাদন কমেছে, বহুজাত হারিয়েছে। (৭) কৃষি শ্রমিকরা পেশা বদল করেছে। (৮) সুন্দরবনের গাছে আগামরা রোগ লেগেছে। (৯) সংরক্ষিত বনগুলো ধ্বংসের মুখে। (১০) প্রাকৃতিক সম্পদ নির্ভর জীবিকা বদলে যাচ্ছে। (১১) বিদেশি গাছ লাগানোর প্রবণতা বেড়েছে। (১২) মাছের অনেক প্রজাতি হারিয়ে গেছে। (১৩) পুরোনো পেশা ছেড়ে নতুন পেশায় যাচ্ছে অনকে। (১৪) দরিদ্র পরিবারে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। (১৫) অপরিকল্পিত বাঁধ ও সুইসগেটের কারণে সেচ সংকট বেড়েছে। (১৬) কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পরিধি সংকুচিত হয়েছে। (১৭) নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। (১৮) বর্ষায় বৃষ্টি কমেছে, শীতকালে শীত কমেছে, গ্রীষ্মেও তাপ বেড়েছে। (১৯) নদী ভাঙনের প্রবণতা বেড়েছে। (২০) কোনো কোনো ফসলে আবাদ কমেছে (আমন), আবার কোনোটির আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে (বোরো)। (২১) বিভিন্নজাতের ২০০ প্রজাতির ধান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। (২২) হাওরের বিলে এখন শাপলা-শালুক ফোটে না। (২৩) জৈব সারের উৎস কমে যাচ্ছে। (২৪) ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণাতা ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে করনীয়

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। এটি প্রতিরোধ বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিরোধে মানবজাতির স্বার্থেই সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য করণীয় হলো-

১. ব্যাপকহারে বনায়ন করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চল এবং ফাঁকা স্থানে পর্যাপ্ত গাছ লাগাতে হবে ।

২. অপ্রয়োজনে বৃক্ষ নিধন রোধ করতে হবে। প্রয়োজনের তাগিদে একটি গাছ কাটলে কমপক্ষে ৫টি গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক করতে হবে ।

৩. বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়াতে সহায়ক ক্ষতিকর গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে হবে।

৪. পরিবেশবান্ধব এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

৫. পরিবেশের ক্ষতি করে এরূপ শিল্প কারখানা বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিল্পবর্জ্য শোধনাগারে বর্জ্যকে পরিশোধিত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উপশমে পদক্ষেপ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উপশমে পদক্ষেপ : জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলো টিকে থাকার চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতি রোধে নেওয়া প্রায়াজন বৈশ্বিক উপশম লক্ষ্য, নীতি ও জরুরি কর্মপরিকল্পনা। বৈশ্বিক নীতি ও লক্ষ্য পরিবেশের সুস্থিত অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। দীর্ঘমেয়াদী সুস্মিত অবস্থার জন্য বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করতে হবে এবং ‘low carbob’ উন্নয়ন কৌশল অনুসরণ করতে হবে। বর্তমানে জলবায়ু নীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে উপশমের (mitigation) জায়গায় মানিয়ে নেয়ার (adaptation) নীতি।

জলবায়ু পরিবর্তন রোধে শিল্পোন্নত দেশগুলোর করনীয়

শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের জাতীয় অবস্থার নিরিখে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও সংকোচন করবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনে তাদের ভূমিকাই বেশি। ২০৩০-এর মধ্যে শিল্পোন্নত দেশসমূহ কর্তৃক কিছু শর্ত পালনের সাপেক্ষে কিছু চুক্তি সমন্বয় করা যেতে পারে :
(১) গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি লক্ষ্য ঠিক করে দেয়া। (২) ধনী দেশগুলোর জন্য বহুমাত্রিক শর্তারোপ করা এবং (৩) স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য সেবচ্ছাপ্রণোদিত লক্ষ্য ঠিক করে দেয়া।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৮০ শতাংশ অবদান এনার্জি সেক্টরের। বিশ্বব্যাংকের ধাণানুযায়ী, ২০৩০-এর মধ্যে কার্বন নির্গমন ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এজন্য পরিবেশবান্ধব দূষণহীন প্রযুক্তি দরকার। এ প্রযুক্তি অধিকহারে নবায়নযোগ্য ও স্থানান্তরযোগ্য এনার্জি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারবে।

জলবায়ু পরিবর্তন রোধে উন্নয়নশীল দেশগুলোর করনীয়

টেকসই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে থেকেই উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের উন্নয়নকৌশল গ্রহণ করতে হবে। এসব দেশগুলোর জাতীয় নীতির সঙ্গে উপশম কৌশলকে সমন্বয় করে পরিবেশ উপযোগী উপশম কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। যা হবে পরিমাপযোগ্য, যেন তা প্রতিবেদনাকারে প্রকাশ করা যায় এবং যথার্থতাও যেন নিরূপণ করা যায়। কিছু কিছু উপশম কার্যক্রমে শিল্পোন্নত দেশগুলো যাতে সহায়তা করে সে ব্যাপারে দরকষাকষির কৌশল কাজে লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে দূষণহীন প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদানে উন্নত দেশগুলোকে রাজি করানো এবং তা সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগানো।

উপসংহার

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান শতাব্দীর সবচেয়ে জটিল সমস্যা যা সকল গরীব দেশসমূহকে প্রভাবিত করছে ব্যাপকভাবে। বাংলাদেশ যখন দারিদ্র্য নিরসন, অর্থনৈতিক প্রগতি সাধন, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি বিধানে ব্যাপক ও বহুমুখী প্রাণান্ত প্রক্রিয়ায় বিশেষভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগী, পরিবেশের বিপর্যয় এই সন্ধিক্ষণে সকল প্রয়াসকে স্তব্ধ করে দিতে চলেছে। জলবায়ুর পরিবর্তন আমাদের সাফল্যকে ম্লান করে কৃষি, শিল্প ও স্বাস্থ্য খাতে উৎকর্ষ সাধন ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগকে বিলীন করে দারিদ্র্য নিরসনের প্রক্রিয়ায় শিথিলতা আনতে পারে। সিডর, আইলা, সুনামির মতো কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস, প্লাবনই যথেষ্ট যা আমাদের সকল প্রয়াসকে স্তব্ধ করে দিতে পারে, যার শিকার বাংলাদেশ প্রতি বছর।

[box type=”note” align=”” class=”” width=””]আরও পড়ুনঃ রচনা: বাংলাদেশের কৃষি, কৃষক ও কৃষি উন্নয়ন[/box]

তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হ্রাসে নেয়া পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ডগুলোকে নীতি নির্ধারণের পরিসরে নিয়ে আসা এবং মানিয়ে নেয়া নীতি গ্রহণের পাশাপাশি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত করতে হবে। তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের নঞর্থক সীমানার নিশ্চয়ই সংকোচন ঘটবে এবং এর ফলে কার্বন-নিরপেক্ষ বৈশ্বিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নপূরণের দ্বার উন্মোচিত হবে।

Rimon

This is RIMON Proud owner of this blog. An employee by profession but proud to introduce myself as a blogger. I like to write on the blog. Moreover, I've a lot of interest in web design. I want to see myself as a successful blogger and SEO expert.

মন্তব্য করুন

Related Articles

Back to top button