বাংলা রচনা

রচনাঃ নিরক্ষরতা দূরীকরণ বা গণশিক্ষা

1/5 - (1 vote)
elimination-of-illiteracy-or-mass

সুচনা

দেশের শিক্ষার হার বৃদ্ধি তথা নিরক্ষরতা দূরীকণের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার বিস্তারকে গণশিক্ষা বলা হয়ে থাকে। শিক্ষা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। তাই সমাজের শুধু একটি নির্দিষ্ট ভাগ্যবান শ্রেণিই যদি শিক্ষা পায় এবং অন্যেরা নিরক্ষর থাকে, তাহলে তা দেশের উন্নয়নে তেমন কোনাে সূচনা রাখতে পারে না। আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার মাত্র ৬৪ ভাগের মতাে। আবার সাক্ষরতাই কিন্তু প্রকৃত শিক্ষার মাপকাঠি নয়। কারণ, সাক্ষর মানুষমাত্রই শিক্ষিত নয়। সুতরাং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অশিক্ষিত মানুষকে কেবল সাক্ষরজ্ঞান করাই যথেষ্ট নয়। সাক্ষরতাদানের পাশাপাশি নানা সামাজিক এবং পেশাভিত্তিক বিষয়ে শিক্ষাদান ও গণমানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিই গণশিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত।

শিক্ষার অধিকার ও নিরক্ষরতা

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। একমাত্র শিক্ষার দ্বারাই মানুষ অজ্ঞতা দূর করতে পারে। ভালােমন্দ বুঝে পথ চলতে পারে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সফলতা আনয়ন করতে পারে। এ কারণে কোরআন হাদিসেও শিক্ষা অর্জনের প্রতি গুরুত্ব আরােপ করা হয়েছে। শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রত্যেক দেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষা বিস্তারের জন্য নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করে সেগুলাে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। তাছাড়া জাতিসংঘ শিক্ষা বিস্তারের জন্য নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। কিন্তু এতকিছুর পরও অনেক দেশ থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। সেসব দেশের বৃহৎ জনগােষ্ঠী নিরক্ষরতার অভিশাপ বহন করে চলেছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকার অনেক দেশের মানুষ এখনও নিরক্ষর। বাংলাদেশেও নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা কম নয়। শিক্ষার অভাব এদেশের মানুষকে পিছিয়ে রেখেছে পাশাপাশি দেশকে করে রাখছে অন্ধকারাচ্ছন্ন। বাংলাদেশ বর্তমানে ভৌগােলিকভাবে স্বাধীন হলেও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এদেশের মানুষের জীবনে এখনও আসেনি। এর পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে নিরক্ষরতা। সরকারি হিসেব মতে, বাংলাদেশে ৬৪% লােক শিক্ষিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিক্ষিত মানুষের হার আরও কম। শিক্ষার হার বাড়ানাে না গেলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। এজন্য প্রয়ােজন সমন্বিত কার্যক্রম ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা।

গণশিক্ষার গুরুত্ব

আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই অশিক্ষিত। আর এ কথা বলা বাহুল্য যে, আমাদের দারিদ্র্যের একটি প্রধান কারণ হলাে শিক্ষার অভাব। অশিক্ষিত লােক শুধু দারিদ্র্যেরই কারণ নয়, এর ফলে নানা সামাজিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। আমরা দেখতে পাই, বিশ্বের যে দেশে শিক্ষার হার যত বেশি সাধারণভাবে সে দেশ তত উন্নত। এর ব্যতিক্রম দক্ষিণ এশিয়া নয়। দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কার শিক্ষার হার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত হওয়া সত্ত্বেও দেশটির মাথাপিছু আয় উল্লিখিত ৩টি দেশের চেয়ে বেশি, তাদের জীবনযাত্রাও আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত। আমাদের দেশের পাঁচ কোটিরও বেশি লােক নিরক্ষরতা ও অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত। এ বিশাল জনগােষ্ঠীকে অশিক্ষিত রেখে দেশকে উন্নত করার আকাক্ষা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই গণশিক্ষা কর্মসূচির ব্যাপক ও কার্যকরী সম্প্রসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

গণশিক্ষা কখন ও কেন দরকার হয়

সাধারণত উন্নত দেশগুলােতে দেশের প্রায় সব শিশুই নির্দিষ্ট বয়সেই স্কুলে যাওয়ার সুযােগ পায়। কিন্তু বাংলাদেশের মতাে তৃতীয় বিশ্বের অনেক উন্নয়শীল দেশেই দারিদ্র্য এবং অপরাপর অনেক কারণে সব শিশু নির্দিষ্ট বয়সে স্কুলে যাওয়ার সুযােগ পায় না। যারা পায়, তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করেই ঝরে পড়ে। ফলে দেশের জনগােষ্ঠীর একটি বড় অংশ অশিক্ষিত বা নিরক্ষর থেকে যায়। মূলত বয়স পেরুনাে মানুষের জন্য গ্রহণ করা হয় বয়স্ক শিক্ষাব্যবস্থা। এছাড়া দরিদ্র শিশু, কর্মজীবী শিশু ও নারী যারা শিক্ষা পাচ্ছে না, জনগােষ্ঠীর সে অংশকে সাক্ষর করার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয় গণশিক্ষার নানা কর্মসূচি।

বর্তমান গণশিক্ষার অবস্থা

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনাে গণমুখী নয়। তাই সাধারণ শিক্ষা সবার জন্য সহজলভ্য হয়ে ওঠে না। তবে ইতােমধ্যে গণশিক্ষার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলাে বেশ কার্যকরী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সরকার সম্প্রতি পর্যায়ক্রমে এক একটি জেলাকে নিরক্ষরমুক্ত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। মাগুরা জেলায় প্রথম এ কর্মসূচি সফলভাবে শেষ হয়। সরকারের পাশাপাশি অনেক এনজিও দেশে গণশিক্ষার নানা কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে প্রতি ৫-৬ বছরের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার একটি সন্তোষজনক উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, এক্ষেত্রে মানুষকে শিক্ষিত করাই অধিক জরুরি। আর কাগজে-কলমে শিক্ষার হার বাড়িয়ে কোনাে লাভ নেই। তাতে নিজেদের প্রতারিত করা হবে মাত্র।

গণশিক্ষা ব্যাহত হবার কারণ

গণশিক্ষাকে আরও বেশি কার্যকর করার জন্য সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। আমাদের দেশের নিরক্ষরতা দূরীকরণে এখনাে কোনাে সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। গণশিক্ষার ব্যবস্থাটিও যথেষ্ট পরিকল্পিত নয়। বিভিন্ন সরকার বিক্ষিপ্তভাবে এক্ষেত্রে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তার ফলাফল অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া গেছে অতি সামান্য। গণশিক্ষার জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষক বা শিক্ষাঙ্গন নেই। এছাড়া যেসব সমস্যার কারণে অশিক্ষিত মানুষ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হতে পারছে না সেদিকেও যথেষ্ট নজর দেওয়া হয় না। ঘনঘন সরকার বদল এবং একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক অগ্রসর না হওয়া গণশিক্ষা বিস্তারের অন্তরায়। এছাড়াও দুর্নীতি এবং নানা প্রাসঙ্গিক জটিলতা গণশিক্ষা বিস্তারে অনেক ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

গণশিক্ষা বিস্তারে গণমাধ্যমের সূচনা

দেশের শিক্ষার হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে গণমাধ্যম যেমনঃ রেডিয়াে-টিভিকে কাজে লাগালে তা ফলদায়ক হতে পারে। কারণে, এগুলাের মাধ্যমে বিনােদনের মধ্যদিয়ে একজন মানুষকে শিক্ষার প্রতি আগ্রহী এবং সামাজিকভাবে সচেতন করে তােলা সম্ভব। নিরক্ষরতা দূরীকরণের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিকসহ নানা পেশার মানুষের পেশা সম্পৃক্ত বিষয়ের ওপর আলােকপাত করে রেডিয়াে-টিভি তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সূচনা রাখতে পারে। এছাড়া স্বাস্থ্য, পরিবার-পরিকল্পনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে মানুষকে সচেতন করার জন্য রেডিয়াে-টেলিভিশনকে আরও ব্যাপকভাবে কাজে লাগানাে দরকার। এসব বিষয়ও গণশিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।

শিক্ষিত মানুষের কর্তব্য

আমরা যারা শিক্ষিত তারা প্রায়ই ভুলে যাই অশিক্ষিত মানুষকে জ্ঞানের আলােকে উদ্ভাসিত করা আমাদেরই দায়িত্ব। কোনাে মানুষের শিক্ষা যখন অপরাপর মানুষের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় তখনই সে শিক্ষা সার্থকতা লাভ করে । তাই দেশের শিক্ষিত সচেতন অংশের কর্তব্য নিরক্ষর মানুষ শিক্ষিত করবার খানিকটা হলেও দায়িত্বগ্রহণ। এক্ষেত্রে শুধু সরকার কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলাের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট হবে না। আমাদের দেশের প্রত্যেকটি শিক্ষিত মানুষ যদি মাত্র একটি নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষর করার দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে সমাজ থেকে অশিক্ষা বা নিরক্ষরতার অন্ধকার দূর করা খুব সহজেই সম্ভব। এক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীরা অগ্রণী সূচনা পালন করতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস। গণশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে যদি গণশিক্ষা সম্পৃক্ত একটি নম্বরভিত্তিক ব্যাবহারিক কোর্স রাখা হয়, তাহলে এ পদক্ষেপ দ্রুত কার্যকরী হবে। গণশিক্ষার সুফল ও প্রাথমিক শিক্ষার ফল পাওয়া যায় দেরিতে কিন্তু গণশিক্ষার ফল পাওয়া যায় সাথে সাথে। সকল মানুষই শিক্ষিত হতে চায়। কিন্তু যারা এ সুযােগ থেকে ছােটবেলায় বঞ্চিত হয়েছে তারা বড় হয়ে সুযােগ পেলে তা তারা হাতছাড়া করতে চায় না। অনেক দেশে শুধু গণশিক্ষা নয় বরং অন্ধ, বধির, বিকলাঙ্গ মানুষদের রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে শিক্ষাদান করা হয়। জীবন ও জীবিকার তাগিদে বয়স্ক মানুষ শিক্ষার পেছনে বেশি সময় দিতে পারে না। এজন্য সহজ পদ্ধতি ও সহজ উপকরণের মাধ্যমে তাদের শিক্ষাদান করলে দেশের বঞ্চিত গণমানুষ এর সুফল ভােগ করতে পারবে।

উপসংহার

কেবল প্রচারের উদ্দেশ্যে কাগজে-কলমে হার বাড়িয়ে দেশের কোনাে উন্নতি আশা করা যায় না। এজন্য দরকার আন্তরিকতা ও কার্যকরী পদক্ষেপ। নিরক্ষরতা দূরীকরণকে একটি সামাজিক বা জাতীয় আন্দোলন রূপে গ্রহণ করা দরকার। কারণ, একুশ শতকে অশিক্ষিত জনগােষ্ঠী নিয়ে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অসম্ভব। এজন্য কেবল সরকারের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দেশের সব শিক্ষিত মানুষকে এক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবার মন নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। আমরা যদি আমাদের একজন প্রতিবেশী, একজন অশিক্ষিত আত্মীয় বা ঘরের কাজের মেয়েটিকে সাক্ষর করার দায়িত্ব নেই- তাহলে খুব দ্রুতই নিরক্ষরতা দূরীভূত হতে পারে। মনে রাখা দরকার, গুটিকয়েক শিক্ষিত মানুষ জাতিকে উন্নত করতে পারে না। আর জাতির উন্নতির ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বের বুকে আমাদের অবস্থানের তাৎপর্য। তাই আমাদের নিজেদের স্বার্থেই নিরক্ষরতার অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়ে যেতে হবে। কারণ, শিক্ষা যেভাবে দেশের ভাবমূর্তিকে নানাক্ষেত্রে দ্রুত উজ্জ্বল করতে পারে আর কোনাে কিছুতেই তা সম্ভব নয়।


 এই রকম আরও তথ্য পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন। এর পাশাপাশি গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন। 

Rimon

This is RIMON Proud owner of this blog. An employee by profession but proud to introduce myself as a blogger. I like to write on the blog. Moreover, I've a lot of interest in web design. I want to see myself as a successful blogger and SEO expert.

মন্তব্য করুন

Related Articles

Back to top button