বাংলা রচনা

অপসংস্কৃতি ও বর্তমান যুবসমাজ || রচনা || সমাজ জীবনে অপসংস্কৃতির প্রভাব

Rate this post
রচনাঃ অপসংস্কৃতি ও বর্তমান যুবসমাজ
ছবি সূত্রঃ iStockPhoto

ভূমিকা

জাতির যুগ-যুগান্তরের স্বপ্ন ও সাধনা, তার ভাবলােকের গৌরব ও সমুন্নতি তিল তিল সঞ্চয় করে সৃষ্টি হয় সংস্কৃতির ধারা। সমগ্র জাতির চিন্তাধারা, ভাবধারা ও কর্মধারার গৌরবময় প্রতিচ্ছবিই হল তার সংস্কৃতি। মানবীয় আচারপদ্ধতি, শিক্ষা-দীক্ষা, মানসিক উন্নতি, পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব- এ সবের ধারা-সমন্বয়ে সৃষ্ট এক অপূর্ব জীবনধারাই হচ্ছে ‘সংস্কৃতি’। সংস্কৃতির মূল কথা হল নিজেকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে গড়ে তােলা এবং অপরের নিকট নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা। প্রেম ও সৌন্দর্য সংস্কৃতির প্রধান আশ্রয়। এ আশ্রয় থেকে বিচ্যুত হলে সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যায় এবং মানুষ অপসংস্কৃতির দিকে ধাবিত হয়। শিক্ষা ও সভ্যতার অবনতি ঘটিয়ে যে সংস্কৃতি মানুষকে সুন্দর থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তাই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি মানুষকে কলুষিত করে এবং জীবনের সৌন্দর্যবিকাশকে স্তব্ধ করে দিয়ে শ্রীহীনতার দিকে ঠেলে দেয়।

সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতি কী

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘কমল হীরের পাথরটাকে বলে বিদ্যে আর তা থেকে যা ঠিকরে বেরােয়, তাকে বলি কালচার।’ অর্থাৎ সংস্কৃতি সেই চিৎপ্রকর্ষ বা আলাে যা চেনায় জাতির স্বরূপকে। মােতাহের হােসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘সংস্কৃতি মানে বাঁচা, সুন্দরভাবে বাঁচা।’ আর ড. আহমদ শরীফ সংস্কৃতির সংজ্ঞার্থ দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘পরিশীলিত ও পরিশ্রত জীবনচেতনাই সংস্কৃতি।’ সংস্কৃতির বিপরীত হল অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি জাতির এক মানসিক ব্যাধি। এ অসুন্দরেরই ছদ্মবেশ। এর স্পর্শে মানুষের মন কলুষিত হয়। পরিশীলিত, মার্জিত ও উন্নতবােধের হয় অপমৃত্যু।

সংস্কৃতি জাতির সর্বাধিক বিষয়ে সর্বাঙ্গীণ উন্নতির চরমতম ফল। আমাদের সংস্কৃতি আমাদের জীবনচেতনা। গভীর অর্থে ‘সংকতি’ হচ্ছে পরিশীলিত জীবনবােধ। শিক্ষা ও সভ্যতার আলােকতীর্থে স্নাত হয়ে এ জীবনবােধ জন্ম নিয়ে থাকে। আমাদের দেশ ও মাটির সঙ্গে আমাদের নাড়ির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা যে শিক্ষা গ্রহণ করি তা যদি দেশকে ভালােবাসতে সাহায্য না করে, জীবনকে যদি প্রেমময় করে গড়ে তুলতে না পারে তাহলে সে শিক্ষা অপশিক্ষারই নামান্তর। আর এ অপশিক্ষা থেকেই অপসংস্কৃতি মাথা তুলে দাঁড়ায়। বর্তমানে আমরা অপশিক্ষার মােহে আবেগপ্রবণ হয়ে বিদেশি গান, বিদেশি অশােভন নাচ এমনকী পােশাক-পরিচ্ছদ অনুকরণ করে সংস্কৃতিমান হওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এগুলােকে কোনাে মতেই আমাদের সংস্কৃতি বলে গ্রহণ করা যায় না। কারণ এ সব গান, নাচ আর পােশাকের সঙ্গে আমাদের দেশের প্রকৃতির কোনাে সম্পর্ক নেই। সংস্কৃতির মুকুরে ধরা পড়ে জাতির এমন একটি মানসিকতা, এমন একটি সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা, শিল্প-সাহিত্যের এমন কারুকীর্তি, ধর্মের ভাব-প্রেরণা ও ঐতিহ্যের চরম সমুন্নতি, যা জাতির আনন্দময় অবচেতন মনের সামগ্রিক প্রয়াস, যা যুগ যুগান্তরের নিরবচ্ছিন্ন সাধনার সর্বশ্রেষ্ঠ ফসল। অপরদিকে অপসংস্কৃতির অশুভ ছায়াপাতে জাতির জীবন হয় তমসাবৃত। অমঙ্গল, অকল্যাণের সাধনাই অপসংস্কৃতির সাধনা।

অপসংস্কৃতি ও সমাজজীবনে অপসংস্কৃতির প্রভাব

বর্তমানে আমাদের দেশে সংস্কৃতির অবক্ষয় বা অপসংস্কৃতি দিনে দিনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমাজের সর্বস্তরে বিকৃতি , জাতিকে আজ যেন গ্রাস করতে উদ্যত। সাহিত্যের নামে কুরুচিপূর্ণ কিছু রচনা বাজার ছেয়ে ফেলছে। এ প্রসঙ্গে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘রহমানে শয়তানে যে তফাত, আঙুরে ও শরাবে যে তফাত, মুক্তি ও বন্ধনে যে তফাত, আসল সাহিত্য ও এই সকল সাহিত্যে সেই তফাত। হায়! অবােধ পাঠক জানে না। সাইরেনের বাঁশরির সুরের ন্যায় এই অসাহিত্য তাকে ধ্বংসের দিকে পলে পলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।’ জাতির সমস্ত যৌব-শক্তি এই অপসাহিত্য জোকের মত নিঃসাড়ে চুষে নিচ্ছে। সাহিত্যের হাটে যে কেবল এই কামাগ্নিসন্দীপনী বটিকাই বিক্রি হচ্ছে তা নয়। এর চেয়েও ভয়ানক ভয়ানক জিনিস একেবারে সাক্ষাৎ বিষ— নানা মনােহর নামে ও রপে কাটতি হচ্ছে। পরখ করলেই অনায়াসে দেখা যাবে সেগুলাের ভিতর আছে কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, জাতীয় বিদ্বেষ প্রভৃতি। জাতির আত্মা ও মনকে এ সমস্ত বিষাক্ত করে দেশে কি অশান্তিই না ঘটাচ্ছে। সৎকার্য ও সৎচিন্তার মধ্য দিয়ে প্রকৃত ধর্মকার্য আজ অনুপস্থিত, ধর্মের নামে লােক-দেখানাে কিছু আচারঅনুষ্ঠানের প্রাধান্য লক্ষ্যের চেয়ে উপলক্ষকে বড় করে তুলেছে। এছাড়া, শিক্ষার নামে কুশিক্ষা, সমাজসেবার নামে দলাদলি, সঙ্গীতের নামে সঙ্গীতহীন কতক হৈচৈ এবং বেশভূষার নামে হাস্যকর কিছু অনুকৃতি সাংস্কৃতিক জীবনে গ্লানি ও মিথ্যাচারকে পুঞ্জীভূত করছে।

বিদেশি সংস্কৃতিকে আমরা একবাক্যে অপসংস্কৃতি বলে আখ্যায়িত করে থাকি। আসলে কথাটা সর্বাংশে ঠিক নয়। বিদেশের সবকিছুই আমাদের জন্যে অপসংস্কৃতি, তা নয়। তবে বিদেশের কোনাে কিছুকে গ্রহণ করার আগে দেখতে হবে তা আমাদের জীবনকে সুন্দর বা উন্নত করছে কিনা, আমাদের চেতনাকে উদার কিংবা মহান করছে কিনা। যা আমাদের জীবনবােধকে পরিশীলিত করে তা অপসংস্কৃতি নয়। কিন্তু আমরা যদি ডিসকো গান, নাচ, পাশ্চাত্য মডেলের পােশাকের মােহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি তা হলে সেটা স্বাভাবিকভাবেই অপসংস্কৃতি হবে। সংস্কৃতি চর্চার বিভিন্ন দিক রয়েছে, মূল্যবােধের দৃষ্টিতে যারা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে তাদের কাছেই তা হয়ে ওঠে প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতীক।

অপসংস্কৃতি ও তরুণ সমাজ

সমাজবিজ্ঞানী E. B. Taylor বলেন, ‘Cultural perversion might lead the youth generation to contamination and destruction’. আজকের তরুণরাই দেশের আগামী দিনের অমূল্য সম্পদ। তারাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু অপসংস্কৃতি তাদের জীবনকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তারা এমন কিছু বিষয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে যা জীবনকে সুন্দর করে বিকাশের ক্ষেত্রে মােটেই সহায়ক নয়। বলতে দ্বিধা নেই যে, আমাদের দেশে যে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে তার মূলে রয়েছে দুর্নীতি। যে সমাজে দুর্নীতি আছে সে সমাজ থেকে নিজস্ব সংস্কৃতি আশা করা যায় না। তাই অপসংস্কৃতি এখন সংস্কৃতির আসন দখল করে নিয়েছে। ফলে সত্য ও সুন্দরকে বিসর্জন দিয়ে তরুণরা উগ্র জীবনবােধে মাতাল হয়ে উঠেছে। টেলিভিশন ও প্রেক্ষাগৃহের রূপালি পর্দায় এখন যে সমস্ত ছবি দেখানাে হচ্ছে তার অধিকাংশ আমাদের সমাজ ও মন-মানসিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

দিনে দিনে এমন সব অশ্লীল ছবি আমাদের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে, অচিরেই এর একটা ভয়ঙ্কর পরিণতি শুরু হয়ে যাবে। যেমন : আজকাল অনেক তরুণকে মেয়েদের মতাে হাতে বালা বা পিতলের কড়া এবং এক কানে দুল পরতে দেখা যায়, দেখা যায় মেয়েদের মতাে লম্বা চুল রেখে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেধে রাখতে। এসব ফ্যাশন করে তাদের মনে আনন্দ হলেও এটা কিন্তু অপসংস্কৃতিরই নামান্তর। আবার মেয়েদেরও অনেক সময় ছেলেদের মতাে শার্ট, টাইট জিন্স-প্যান্ট , চুলের বয়-কাট, চলাফেরায় ছেলেদের আচার-আচরণ লক্ষ করা যায়, এর কোনােটাই কিন্তু সুখকর নয়। এসব উগ্র জীবনবােধ থেকে যুবসমাজ বিরত না হলে সামাজিক পরিবেশেও অবক্ষয় ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইতােমধ্যেই এর বিষময় প্রভাব আমাদের সমাজে পড়তে শুরু করেছে।

আমাদের তরুণ সমাজ অপসংস্কৃতির স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে শৃঙ্খলাহীন জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যে যুবসমাজ দেশ ও জাতির অফুরন্ত প্রাণশক্তি, তার কর্মপ্রেরণা, তার অগ্রগতি, সেই যুবসমাজের এক গরিষ্ঠ-অংশই আজ অপসংস্কৃতি-কবলিত। উদ্দেশ্য, দেশের এই সবুজপ্রাণ যুবশক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। এর দুর্নিবার নেশায় আজ যুবসমাজের এক বৃহৎ অংশ ছুটে চলেছে অনিশ্চয়তার পথে। তলিয়ে যাচ্ছে নানারকম নেশার সামগ্রীর মধ্যে। অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে নানাবিধ মাদকাশ্রয়ী ওষুধ ও সুরাপানে। চতুর্দিকে চলেছে যুবসমাজকে আদর্শভ্রষ্ট করার এক সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। যুবসমাজের এই অপসংস্কৃতি-প্রিয়তা সুখসমাজ বিকাশে বিরাট অন্তরায়। এটি বিনষ্ট করে জাতীয়-ঐক্য। গ্রাস করে মহৎ-মানসিকতা।

অপসংস্কৃতি রােধ করার উপায়

কোনাে দেশের যৌবনশক্তি নিজে নিজেই বিকশিত হয় না। তাকে বিকশিত হওয়ার সুযােগ দিতে হয়। তার জন্যে প্রয়ােজন অনুকূল এক সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবেশের। যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুবসমাজের এই বিপথগামিতা, সেই পরিবেশের আমূল সংস্কার অপরিহার্য। শুধু পরিকল্পনা করে কিছু করা যায় না, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়া উচিত সর্বাগ্রে। সমাজ থেকে অপসংস্কৃতির প্রাদুর্ভাব দূর করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রথমে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষিত শ্রেণীর দায়িত্ব অনেক বেশি। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষকে সচেতন করতে হবে। নিষিদ্ধ করতে হবে অপসংস্কৃতির বেসাতি। তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে নতুন মূল্যবােধে। সুযােগ দিতে হবে আত্মবিকাশের। কেননা রােগীর মধ্যেই থাকে রােগ-ত্রাণের প্রতিষেধক। মনে রাখতে হবে, আদর্শভ্রষ্টতাই একালের যুবসমাজের একমাত্র চিত্র নয়। এক শ্রেণীর যুবসমাজ বেশ আদর্শবাদী। সামাজিক অবিচার, অর্থনৈতিক শােষণ, রাজনৈতিক শঠতা সবকিছুর বিরুদ্ধেই এরা সােচ্চার। অপসংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে গিয়ে অলস তন্দ্রায় আচ্ছন্ন, সঠিক পথনির্দেশনা পেলে এই যুবসমাজই আবার হবে দুর্মর প্রাণশক্তিতে। ফিরে পাবে তার হারানাে শুভবুদ্ধি। আবার তাদের প্রার্থণামন্ত্র হবে – 

নবজীবনের গাহিয়া গান,
সজীব করিব মহাশ্মশান।

উপসংহার

সংস্কৃতি প্রতিটি জাতির জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যদি তা অপসংস্কৃতি না হয়। অপসংস্কৃতি জীবনকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই অপসংস্কৃতি যাতে সমাজকে কলুষিত করতে না পারে সে জন্যে রাষ্ট্রপরিচালকদের সচেতন হতে হবে তেমনি সচেতন হতে হবে সর্বশ্রেণীর নাগরিকদের , তাহলেই একটি সুন্দর ও সুস্থ সমাজ গড়ে হতে পারে ।


 এই রকম আরও তথ্য পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন। এর পাশাপাশি গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন। 

Rimon

This is RIMON Proud owner of this blog. An employee by profession but proud to introduce myself as a blogger. I like to write on the blog. Moreover, I've a lot of interest in web design. I want to see myself as a successful blogger and SEO expert.

মন্তব্য করুন

Related Articles

Back to top button