বাংলা রচনা

রচনা : ডেঙ্গুজ্বর ও তার প্রতিকার

4.3/5 - (552 votes)

সূচনা

সাম্প্রতিক সময়ে যে রােগটি জাতীয় জীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে সেটি হলাে ডেঙ্গুজ্বর। ডেঙ্গু নামক ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে ক্লাসিক্যাল বা হােমােরেজিক ধরনের তীব্র জ্বরকেই ডেঙ্গুজ্বর বলে। এটি রােগীর জন্যে তীব্র কষ্টদায়ক এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে। ২০০০ সালে এ জ্বরটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে মহামারি আকার ধরাণ করে। এডিস নামক এক প্রকার মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক। 

ডেঙ্গুজ্বর কি

ডেঙ্গুজ্বর (Dengue)  প্রধানত এশিয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় এলাকার একটি ভাইরাসঘটিত সংক্রামক ব্যাধি। ডেঙ্গু ভাইরাস Flaviviridae গোত্রভুক্ত, যার প্রায় ৭০ ধরনের ভাইরাসের মধ্যে আছে ইয়োলো ফিভার (yellow fever) ও কয়েক প্রকার এনসেফালাইটিসের ভাইরাস।

ডেঙ্গু শব্দের উদ্ভব 

ডেঙ্গু উদ্ভব ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে তা বলা মুশকিল। তবে ধারনা করা হয় এটি এসেছে ‘সোয়াহিলি’ শব্দবন্ধ কা-ডিঙ্গা পেপো, যার অর্থ দুষ্ট আত্মার কারণে ঘটিত রোগ। সোয়াহিলি শব্দ ডিঙ্গা খুব সম্ভবত স্পেনীয় শব্দ “ডেঙ্গু”র মূলে আছে যার অর্থ খুঁতখুঁতে বা সাবধানী, যা ডেঙ্গু জ্বরের হাড়ের ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তির চলনকে বর্ণনা করে। ডেঙ্গু জ্বর কথাটির সর্ব প্রথম ব্যবহার হয় ১৮২৮ সালের পর। 

ডেঙ্গুজ্বরের ভাইরাস বাহকের পরিচয়

ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণু বহনকারী মশাটির নাম এডিস মশা। এটি দেখতে অন্যান্য মশার মতাে হলেও সামান্য কিছু পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্যই অন্যান্য মশা থেকে এডিস মশাকে আলাদা করে চেনা যায়। এডিস মশা দেখতে গাঢ় নীলাভ কালাে রঙের। এ মশার সারা শরীরে সাদা-কালাে ডােরাকাটা দাগ থাকে। এর পেছনের পা-গুলাে সামনের পা-গুলাে থেকে অপেক্ষাকৃত লম্বাটে ধরনের হয়ে থাকে। মূলত এই প্রজাতির স্ত্রী মশা ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণু বহন করে থাকে। এর একটি প্রজাতির নাম এডিস এজিপটাই ও অন্যটির নাম এডিস এবললাপিকটাস। 

ডেঙ্গুজ্বরের উদ্ভব

ডেঙ্গুজ্বরের প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় জিন বংশের (২৬৫-৪২০ খ্রীষ্টাব্দ) এক চীনা মেডিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়ায় (বিশ্বকোশ) যেখানে উড়ন্ত পতঙ্গের সাথে সম্পর্কযুক্ত “জলীয় বিষ”-এর কথা বলা হয়েছে। তবে ডেঙ্গু মহামারী সম্পর্কিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় ১৭৭৯ ও ১৭৮০। ওই সময়ে এশিয়ার অনেক দেশ, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকা এর কবলে পড়েছিল। ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অনিয়মিত হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্দের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর প্রাদুর্ভাব এতই বেড়ে যায় যে তা মহামারী আকার ধারণ করে। এরপর ১৯৫৩ সালে ফিলিপাইনে এর রূপ চরমে উঠে।  

ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল

অন্যান্য ভাইরাসের মতােই ভেজা, পুঁতিগন্ধময় ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় ডেঙ্গু ভাইরাস জন্ম নেয়। বিশেষভাবে এডিস মশার আবাসস্থলে এ ভাইরাস দ্রুত ছড়ায়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলাে এডিস মশা অন্যান্য মশার মতাে ময়লা পানি ও আবর্জনায় বাস করে না। এরা সাধারণত স্বচ্ছ পানিতে ও বাড়িঘরের কাছাকাছি গাছপালায় বসবাস করে। বিশেষ করে ঘরে ফুল বা গাছের টবে এরা ডিম পাড়ে। ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল হিসেবে সাধারণত বাড়িঘরের নিকটবর্তী পচনশীল লতাপাতা, পরিত্যক্ত টায়ার ও নারকেলের খােসায় জমে থাকা পানি, খাদ্য, ফ্রিজ, নালা, ডােবা, নর্দমা, টবের পানি, গােবর, টয়লেট প্রভূতিকে চিহ্নিত করা যায়। 

সময়কাল ও তার বিস্তারের সম্ভাব্য এলাকা

গরম এবং বর্ষার সময়ই আমাদের দেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ বাড়ে। মূলত মে থেকে সেপ্টেম্বর এই পাঁচ মাস ডেঙ্গুজ্বরের মৌসুম বলা চলে। তবে শীতকালে সাধারণত ডেঙ্গুজ্বর হয় না। গ্রামাঞ্চলে যারা বসবাস করেন তাদের মাঝে তুলনামূলক ডেঙ্গুজ্বর কমই হয়। ডেঙ্গুজ্বরে বেশি আক্রান্ত হন শহর অঞ্চলের মানুষেরা। সাধারণত বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় যেখানে বড় বড় দালানকোঠা আছে সেসব জায়গার মানুষই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই ডেঙ্গুজ্বরে বেশি আক্রান্ত হন।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ

ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের মানুষের শরীরে পরিবেশগতভাবেই সংক্রমিত হয়ে থাকে। তবে এডিস মশার দ্বারা এটি সহজে মানবদেহে প্রবশে করতে পারে। ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তির শরীরে স্বাভাবিক জ্বরের মতােই জ্বর দেখা যায়। 

ডেঙ্গুর উপসর্গ

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত শতকরা ৮০ ভাগ রোগী থাকেন উপসর্গবিহীন। সামান্য জ্বরের মতো উপসর্গ থাকে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে (৫%) তা জটিল হতে পারে। ডেঙ্গুজ্বর স্বল্প অনুপাতে প্রাণঘাতী।

ইনকিউবিশন পিরিয়ড (উপসর্গসমূহের সূত্রপাত থেকে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের মধ্যবর্তী সময়) স্থায়ী হয় ৩-১৪ দিন, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা হয় ৪-৭ দিন।

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রােগীর উপসর্গগুলাে মারাত্মকভাবে প্রকাশ পায়। 

  • জ্বর আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ১০৫° ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠে। 
  • খাদ্যে অরুচি ও বমি বমি ভাব দেখা দেয়। বমিও হতে পারে। 
  • সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা দেখা দেয়। বিশেষ করে মেরুদণ্ড, হাড় ও মাথায় অসহ্য ব্যথা হয়। 
  • চামড়ার নিচে ও চোখের সাদা অংশে রক্ত জমাট বাঁধে। ঠোট, জিহ্বসহ মুখমণ্ডল রক্তিমাভ হয়ে ওঠে। শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
  • রক্তচাপ নেমে আসে এবং পিপাসা বৃদ্ধি পায়। 
  • শরীরের অভ্যন্তরে, নাক, মুখ ও মলদ্বারে রক্তক্ষরণ হয়। 
  • প্রচণ্ড জ্বর ও রক্তক্ষরণে রােগী মারা পর্যন্ত যেতে পারে।

ডেঙ্গুজ্বরের প্রকারভেদ 

ডেঙ্গুজ্বর প্রধানত তিন ধরনের হয়। ‘

১। ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু 

২। হেমোরেজিক ডেঙ্গু ফিভার ও 

৩। ডেঙ্গু শক সিনড্রোম

ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু 

ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রচণ্ড জ্বর, মাথা ব্যথা, মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যথা হতে পারে। সেই সঙ্গে বুকে এবং শরীরের নিম্নাঙ্গে উজ্জ্বল লাল ফুস্কুরি, পাকস্থলির প্রদাহ অথবা পেটে ব্যথা, বমি ভাব বা বমি হওয়া এবং ডায়রিয়াও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জ্বর সাধারণত ২-৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। জ্বরের তাপমাত্রা খুব সামান্য পরিমাণে ওঠা-নামা করে। অনেক ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা অথবা অন্যান্য জ্বরের সঙ্গে এই জ্বর সাদৃশ্যপূর্ণ।

হেমোরেজিক ডেঙ্গু ফিভার

ডেঙ্গুজ্বরের মধ্যে হেমোরেজিক ফিভার সবচেয়ে জটিল। এই জ্বরে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু সমস্যা দেখা দেয়। যেমন : রক্তবমি, পায়খানার সঙ্গে তাজা রক্ত বা কালো পায়খানা হতে পারে, চোখের মধ্যে ও চোখের বাইরে রক্ত পড়তে পারে

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম

ডেঙ্গু জ্বরের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে রোগীর মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সঙ্গে সার্কুলেটরি ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনন্ড্রোম হয়। 

ডেঙ্গুর কার্যপ্রণালী 

ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশা যখন কাউকে কামরায় তখন, তখন মশার লালার সাথে ভাইরাস ত্বকের ভিতর প্রবেশ করে। এরপর ভাইরাসটি তার বাসস্থান পাকা করে নেয় এবং রক্তকোষে প্রবেশ করে। রক্তের সাথে এই ভাইরাস কোষের সর্বত্র বিচরণ করে এবং ভাইরাস প্রজননকার্য চালিয়ে যায়। এর প্রতিক্রিয়ায় শ্বেত রক্তকোষগুলি বহুসংখ্যক সিগন্যালিং প্রোটিন তৈরি করে, যেমন ইন্টারফেরন, যা অনেকগুলি উপসর্গের জন্য দায়ী, যেমন জ্বর, ফ্লু-এর মত উপসর্গ, এবং প্রচন্ড যন্ত্রণা। শরীরের ভিতরে ভাইরাসের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে শরীরেরঅনেক প্রত্যঙ্গ (যেমন যকৃত এবং অস্থিমজ্জা) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এবং রক্তস্রোত থেকে তরল ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলির দেওয়াল থেকে শরীরগহ্বরে চুঁইয়ে পড়ে। ফলে, রক্তনালিগুলিতে কম রক্ত সংবহিত হয় এবং রক্তচাপ এত বেশি কমে যায় যে প্রয়োজনীয় অঙ্গসমূহে যথেষ্ট পরিমাণে রক্ত সরবরাহ হতে পারে না। অস্থিমজ্জা কাজ না করায় অনুচক্রিকা বা প্লেটলেটসের সংখ্যা কমে এতে রক্তপাতের সম্ভাবনা বেড়ে যায় যা ডেঙ্গু জ্বরের অন্যতম বড় সমস্যা।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায় 

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধী টিকা কয়েকটি দেশে অনুমোদিত হয়েছে। তবে এই টিকা শুধু একবার সংক্রমিত হয়েছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কার্যকর। এডিস মশার কামড় এড়িয়ে চলাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায়। ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রথম ও প্রধান উপায় হলো এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধ করা। এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা বৃষ্টির পানি ও পরিষ্কার পানি, ৪/৫ দিন জমে থাকা পানি হল এডিস মশার বংশ বিস্তারের স্থান। লার্ভা বেশির ভাগই পরিত্যক্ত টায়ার, বালতি, ফেলে দেওয়া নারিকেলের খোল, ফুলদানি, ফুলের টবের নিচের থালায় জমে থাকা পানিতে, এমনকি জমে থাকা গাছের গর্তে এবং এ ধরনের অন্যান্য প্রাকৃতিক স্থানে বড় হয়। পূর্ণবয়স্ক মশা সাধারণত ঘরের ভিতর অন্ধকার জায়গায়– আলমারি, বিছানা বা খাটের তলায় থাকতে পারে। এডিস মশা দিনের বেলা সক্রিয় থাকে তাই এরা সকালে এবং বিকালের শেষ দিকে বেশি কামরায়। তাই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দিনের বেলায় মশারি ব্যবহার করতে হবে। হাত পা যেন ঢাকা থাকে খেয়াল রাখতে হবে। ঘরের চারদিক পরিষ্কার পরিছন্ন রাখতে হবে। কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। 

ডেঙ্গুজ্বর হলে করণীয় 

যেহেতু ডেঙ্গুজ্বরের কোনো প্রতিষেধক নেই সুতরাং নিজ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় পারে এই ভাইরাসকে মারতে। ডেঙ্গু জ্বর হলে পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে এবং বেশি করে তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে। ভিটামিন সি জাতীয় খাবার খেতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এমন খাবার খেতে হবে। জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। প্রায়শ রোগীর শিরায় স্যালাইন দিতে হতে পারে। মারাত্মক রূপ ধারণ করলে রোগীকে রক্ত দিতে হতে পারে।ডেঙ্গু জ্বরে হলে কোন ধরনের এন্টিবায়োটিক ও ননস্টেরয়েডাল প্রদাহ প্রশমী ওষুধ সেবন করা যাবে না  এতে রক্তপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা (WHO) দুই থেকে সাত দিনের মাঝে সাধারণত ডেঙ্গু রোগী আরোগ্য লাভ করে।

উপসংহার 

ইংরেজিতে একটা কথা আছে “prevention is better than cure” ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে আমাদের করণীয় হলো এডিস মশার বংশ-বিস্তার রোধ করা। ডেঙ্গু মশা এবং তার বংশবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ- দুটোই আমাদের চারপাশে বিদ্যমান। তাই ডেঙ্গুজ্বরকে ঠেকিয়ে রাখা কঠিন। ডেঙ্গু আগেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই ডেঙ্গুজ্বরকে ভয় না পেয়ে এর সঙ্গে যুদ্ধ করেই এবং একই সঙ্গে প্রতিরোধ করেই আমাদেরকে চলতে হবে।


 এই রকম আরও তথ্য পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন। এর পাশাপাশি গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন। 

Rimon

This is RIMON Proud owner of this blog. An employee by profession but proud to introduce myself as a blogger. I like to write on the blog. Moreover, I've a lot of interest in web design. I want to see myself as a successful blogger and SEO expert.

মন্তব্য করুন

Related Articles

Back to top button