রচনাঃ স্বাবলম্বন । প্রবন্ধ রচনা স্বাবলম্বন

    রচনাঃ স্বাবলম্বন । প্রবন্ধ রচনা স্বাবলম্বন

    সূচনা


    কারাে ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার নামই স্বাবলম্বন। অন্য কথায়, মানুষ তার জীবননির্বাহ করতে, সকল প্রয়ােজনে যখন নিজের ওপর নির্ভর করে তখন তাকে স্বাবলম্বন বলে। স্বাবলম্বন মানুষের এমন একটি স্বকীয় বৈশিষ্ট্য যা তাকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক বা জাতীয় পর্যায়ে মর্যাদার সাথে টিকে থাকতে সাহায্য করে। সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মে স্বাবলম্বনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই প্রতিটি মানুষের স্বাবলম্বী হওয়া একান্ত প্রয়ােজন। 


    নৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি


    ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও আত্মনির্ভরশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক নিজেই বলেছেন, “যে জাতি তার আপন ভাগ্য পরিবর্তন করে না, আমি তার ভাগ্য পরিবর্তন করি না।” এই বাণীর মর্মার্থ হলাে, আল্লাহ মানুষকে স্বাবলম্বী হতে বলেছেন। ইংরেজিতেও একটি প্রবাদ আছে- “God helps those who help themselves.” সুতরাং উন্নত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যে মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। 


    জীবনের সার্থকতা


    যে ব্যক্তি আত্মনির্ভরশীল তার জীবন সার্থক। কারণ পরের ওপর নির্ভরশীলতা দ্বারা মানুষের আত্মশক্তির বিকাশ না ঘটিয়ে বরং সংকুচিত করে। যে ব্যক্তি আত্মনির্ভরশীল নয় তার আত্মশক্তি বলতে কিছু নেই। প্রতি কাজে তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। এরকম মেরুদণ্ডহীন মানুষের জীবনে কোনাে সাফল্য বা প্রতিষ্ঠা আসে না। যে লােক মনে করে তার সব কাজে কেউ-না-কেউ এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে, তার কষ্ট লাঘব হবে, সে আসলে অকর্মণ্য। সে কোনােদিন সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, তার আত্মসম্মানবােধ জাগ্রত হয় না। এ ধরনের মানুষ সমাজে কাম্য হতে পারে না। তাই জীবনকে সার্থক করে তুলতে সবাইকে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। 

    স্বাবলম্বনের দৃষ্টান্ত


    মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষকে কোনাে না কোনাে প্রতিভা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। স্বাবলম্বনের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে। বিশ্ব প্রকৃতিতে বিভিন্ন জীবজন্তুর মধ্যে, এমনকি কীটপতঙ্গের মধ্যেও আমরা স্বাবলম্বনের চরম দৃষ্টান্ত লক্ষ করি- যা আমাদের জীবনে অনুকরণীয়। বাবুই পাখি তার আপন ক্ষুদ্র বাসাটি বহু পরিশ্রমের বিনিময়ে গড়ে তােলে, পিপীলিকা স্বীয় স্বাবলম্বনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমাদের উচিত এ সকল ক্ষুদ্র প্রাণীদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া। 

    স্বাবলম্বী হওয়ার সাধনা


    স্বাবলম্বন মানুষের মধ্যে আপনা-আপনি গড়ে ওঠে না। সুষ্ঠু শিক্ষার মধ্য দিয়ে এ সম্পদ অর্জন করতে হয়। বাল্যকালে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর থেকেই ক্রমে বিদ্যালয় ও গৃহ থেকে এ স্বাবলম্বনের শিক্ষা অর্জন করতে হয়। যারা জীবনের প্রথম থেকেই পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং সেভাবেই গড়ে ওঠে তাদের দ্বারা ভবিষ্যৎ জীবনে মহৎ কিছু করা সম্ভব হয়। কিন্তু যারা জীবনের প্রথম থেকেই অপরের সাহায্যের প্রত্যাশায় না থেকে কাজ করে তারা আপন পায়ে দাঁড়াতে পারে। ছােট শিশু আপন চেষ্টায় বারবার আছাড় খেয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে শেখে। গাছ মাটি থেকে রস আহরণ করেই ক্রমে ক্রমে বেড়ে ওঠে। বাল্যকাল থেকে যদি মানুষ আপন পায়ে দাঁড়াতে শেখে তাহলে তার পক্ষে আত্মশক্তির অধিকারী হওয়া সম্ভব হয়। জ্ঞানীর জ্ঞানসাধনা ও বিজ্ঞানীর বিজ্ঞানসাধনার সার্থকতার জন্য স্বাবলম্বন সবচেয়ে বেশি প্রয়ােজন। স্বাবলম্বী মানুষ আত্মবিশ্বাসী হয়। 

    স্বাবলম্বনের প্রয়ােজনীয়তা


    যুগে যুগে স্বাবলম্বী ও সুপ্রতিষ্ঠিত মানুষেরাই মানুষের ভালােবাসা লাভ করেছেন। সাধারণ মানুষ তাদের আদর্শ অনুসরণ করে। আপন সাধনা দ্বারা যিনি জগতে কিছুই লাভ করতে পারেন না তিনি পৃথিবীকেও কিছুই দিতে পারেন না। সুতরাং পৃথিবীকে কিছু দেওয়ার জন্য প্রয়ােজন স্বাবলম্বন। ব্যক্তিগতভাবে স্বাবলম্বন যেমন বিশেষ প্রয়ােজনীয়, জাতিগতভাবেও এটি অপরিহার্য। জগতে এমন অনেক জাতি আছে যারা অন্ন-বস্ত্রের জন্য অন্যের মুখপানে তাকিয়ে থাকে। কোনাে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি ও জাতির জন্য এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। ব্যক্তিগত ও সামাজিক এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্যে স্বাবলম্বন অত্যন্ত প্রয়ােজনীয়। স্বাবলম্বন মানুষকে স্বাধীন করে নতুন কিছু করার উদ্যম প্রদান করে।


    পরনির্ভরশীলতা দেশ ও জাতির দুঃখের কারণ


    স্বাবলম্বী ব্যক্তি, দেশ ও জাতির জন্য অপরিহার্য। যে দেশ অন্যের ওপর নির্ভরশীল সে দেশের উন্নয়ন কোনাে কালেই সম্ভব নয়। পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের উন্নতির মূলে রয়েছে সে দেশ ও জাতির মানুষের আত্মনির্ভরশীলতা। এশিয়া মহাদেশের অনেক অনুন্নত দেশ রয়েছে যারা এখনাে স্বাবলম্বী হতে পারেনি। ঐসব দেশ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। যে দেশ স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করে না, সে দেশ কখনাে উন্নতি করতে পারে না। পরনির্ভরশীলতা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ। 

    উপসংহার 


    বহু ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশ হলেও একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আমাদের সম্মুখে রয়েছে কঠিন ও কঠোর পথ। এ পথ অতিক্রমের জন্য প্রয়ােজন স্বাবলম্বন। স্বাবলম্বী জাতি হিসেবে আমাদেরকে মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে। স্বাবলম্বী না হলে আমরা প্রকৃত অর্থে পরাধীন রয়ে যাব। তাই প্রকৃত স্বাধীন হওয়ার জন্য আমরা আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করব।


    #স্বাবলম্বন রচনা #স্বাবলম্বন প্রবন্ধ রচনা #স্বাবলম্বন রচনার পয়েন্ট #স্বাবলম্বন রচনার সংকেত #স্বাবলম্বন রচনা pdf download #স্বাবলম্বন রচনা লিখন

    0 Comments