বাংলা রচনা

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প রচনা (এসএসসি এইচএসসি)

4.5/5 - (1902 votes)

 বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প রচনাঃ প্রিয় শিক্ষার্থী, তোমরা অনেকেই বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প রচনাটির জন্য অনুরোধ করেছিলে। তাই বিভিন্ন বই থেকে পয়েন্ট সংগ্রহ করে রচনাটি তোমাদের মাঝে উপস্থাপন করা হল।

ভূমিকা

বাংলাদেশ প্রকৃতির নন্দনকাননের সৌন্দর্যমণ্ডিত কোনাে সার্থক চিত্রশিল্পীর নিখুঁত চিত্রকর্মের সঙ্গে তুলনীয়। ব-দ্বীপ সদৃশ এ বঙ্গভূমির রয়েছে বিচিত্র ভূ-ভাগ এবং সমুদ্র শুনিত বিস্তীর্ণ উপকূল। সমুদ্র তটরেখা ও ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন যা বিদেশি পর্যটকসহ দেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এদেশে পর্যটন শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে আছে সমান্তরাল ভূমি, পাহাড়-পর্বত, জলপ্রপাত, চা-বাগানের আহামরি দৃশ্য, সবুজ গালিচার মতাে শস্য ক্ষেত, মাঠ-প্রান্তর। আর বিশেষ করে মাকড়সার জালের মতাে ছড়িয়ে আছে রূপালি সব ছােটবড় নদী। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণের অভাব নেই। শুধু 

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া…
একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু।

পর্যটনের ধারণা

মানুষ কখনােই এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না, পথ চলাতেই তার আনন্দ। দেশ-দেশান্তরে পরিভ্রমণ করে মানুষ তার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য পিপাসাকে নিবৃত্ত করে। এ পরিভ্রমণকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠেছে পর্যটন শিল্প। মানুষের একে অপরকে জানার আগ্রহ থেকেই পর্যটনের বিকাশ ঘটেছে। হয়ত পর্যটনের নামে নয়, কিন্তু পর্যটন বিষয়টি অনেক পুরাতন। মার্কোপােলাে, ইবনে বতুতা, ভাস্কো-দা-গামা, কলম্বাস, ক্যাপ্টেন কুক, ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং-সহ বিশ্ববিখ্যাত পর্যটকরা ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছেন। সভ্যতা সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভের জন্য, কেউ কেউ অজানা ভূখণ্ডকে আবিষ্কারের জন্য ভয়কে তুচ্ছ করে দেশ পর্যটন করেছেন, পাড়ি জমিয়েছেন অজানার পথ। প্রাণের মায়া ত্যাগ করে অচেনা পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন বলেই অনেক অজানা পাহাড়-পর্বত, মরুভূমি, মেরুদেশ কিংবা অনেক ধ্বংসপ্রাপ্ত সভ্যতার সন্ধান পেয়েছিলেন। এসব কাহিনি পড়ে আজ মানুষের জ্ঞানের ভাণ্ডার পূর্ণ হচ্ছে, মানবসভ্যতা হচ্ছে সমৃদ্ধ।

শিল্প হিসেবে পর্যটন

অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার, অদেখাকে দেখার আকাক্ষায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন, এক  দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণ করাকে পর্যটন বলা হয়। বর্তমানে পর্যটন শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও বিভিন্ন কারণে এদেশের পর্যটন শিল্পকে প্রকৃত শিল্প হিসেবে গড়ে তােলা যায়নি। তবে পর্যটন শিল্পের জন্য প্রয়ােজনীয় সকল উপাদানই বাংলাদেশে পুরােপুরি বিদ্যমান। অবকাঠামােগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে পুরােপুরি শিল্পর মর্যাদায় উন্নতি করা যায়। আর তা সম্ভব হলে বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের পদভারে বাংলাদেশ মুখরিত হয়ে উঠবে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশ একটি সুপ্রাচীন দেশ। প্রাচীনত্বের গরিমায় বাংলা সারা বিশ্বে পরিচিত। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজরাজাদের পৃষ্ঠপােষকতায় এ-দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি দারুণভাবে উন্নতি লাভ করেছে। আমরা জানি খ্রিস্টপূর্বকালে বিশ্ব জয় করেছিল বাংলার মসলিন। পৃথিবীব্যাপী এদেশের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল সােনারগাঁও-এ তৈরি সূক্ষ্ম বস্ত্র মসলিনের মাধ্যমে। দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও ইতিহাস বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে দেশের জন্য আর্থিক সমৃদ্ধি আনয়ন করেছে। বর্তমানে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা বর্তমান। এছাড়াও পৃথিবীর সবচেয়ে বড়াে ম্যানগ্রোভ বন (সুন্দরবন) রয়েছে বাংলাদেশে যা বিশ্ববাসীর মনােযােগ আকর্ষণে রাখতে পারে ব্যাপক ভূমিকা। আমাদের রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত যা অবিচ্ছিন্নভাবে ১২০ কিলােমিটার দীর্ঘ। আরাে একটি কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে গৌরবজনক আসন অলংকৃত করে আছে, তা একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

বস্তুত ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের দেশটি যেন প্রাকৃতিক এক মিউজিয়াম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর উপমহাদেশের এ দেশটি তাই মন-মাতানাে, দৃষ্টিনন্দন এবং কবি লেখক তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। চোখ জুড়ানাে মন ভুলানাে এ দেশ আমার আপনার গর্ব। এর সৌন্দর্যে বিভাের হয়ে কবি পেয়েছে ভাষা, মানুষ পেয়েছে আশা। পর্যটক চোখ খুলে মন ভরে উপভােগ করে এর সৌন্দর্য, মেটায় অন্তরের তৃষ্ণা ভ্রমণের মাধ্যমে। তাইতাে কবি বলেন,

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি

নদীর বুকে ভেসে থাকা রং-বেরঙের পাল তােলা সারিসারি নৌকা মণ-প্রাণকে দোলা দেয় । ছােটবড় ঢেউ এবং কখনাে নিস্তরঙ্গ পানির উপর দিয়ে ভেসে থাকা যন্ত্রচালিত জলযান, লঞ্চ, স্টিমারের যাতায়াত দর্শনার্থী মানুষের মনে জাগায় পুলক। বাংলার এই রূপে মুগ্ধ হয়েই কবি গেয়েছেন-

আমার দেশের মাটির গন্ধে ভরে থাকে সারা মন,
শ্যামল কোমল পরশ ছড়ায় নেই কিছু প্রয়ােজন।

ছয় ঋতুর এ-দেশে কত রুপ, কত গান, তা দেখে উদাস পথিকের তেষ্টা মেটে না। সবার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ে গান-

আজো মা তাের মুখের হাসি হয় নি দেখা দুচোখ ভরে,
আজো মা তাের গল্প আমায় হৃদয়-দেহ পাগল করে।

বাংলাদেশের অনুপম নিসর্গ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পর্যটন শিল্প প্রসারের অনন্য উপাদান। এ অনুপম নৈসর্গিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপভােগের জন্য বাংলাদেশে যুগে যুগে হাতছানি দিয়েছে কাছের ও দূরের ভ্রমণপিপাসুদের। তারা অবাক হয়ে দেখেছে এই পৃথিবীতে এমন একটি দেশ আছে যা ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’, সবুজ শ্যামল প্রকৃতিময় আর আছে সুখ-শান্তি সমৃদ্ধির অফুরন্ত ভাণ্ডার। অনেকেই তাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় প্রশস্তি গেয়েছেন বাংলাদেশের মনোলােভা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের। এমনই একজন পর্যটকের উক্তি –

বাংলাদেশে প্রবেশের হাজার দুয়ার খােলা রয়েছে কিন্তু বেরুবার একটিও নেই।

তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটন এমনই এক অর্থনৈতিক খাত যেখানে প্রচুর বিনিয়ােগ না করেও বিপুল আয় করা সম্ভব। পর্যটনের জন্য তেমন নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হয় না। শুধু প্রকৃতি প্রদত্ত উপকরণকে রূপান্তরের মাধ্যমে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করলেই চলে। পর্যটন স্পটগুলােকে সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করলেই এ খাতে বিপুল আয় করা সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশ আছে যাদের জাতীয় আয়ের বিরাট অংশই পর্যটন খাত হতে আসে।

বিশ্বায়নের যুগে পর্যটন শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

পৃথিবীকে আজ আমরা গ্লোবাল ভিলেজ বলছি। অর্থাৎ সারা পৃথিবীর সব দেশ মিলেমিশে একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী উন্নত যােগাযােগ ব্যবস্থা ও তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লবের ফলে সময় এসেছে পরস্পরের কাছে পরস্পরকে মেলে ধরার। নিজের দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ভ্রমণপিপাসু বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপনের এখনই সময়। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতাে বাংলাদেশেও পর্যটন শিল্প যথাযথ উন্নতি ও তদারকির মাধ্যমে লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

আমাদের বৈদেশিক আয়ের একটা বিশেষ উৎস পর্যটন শিল্প। বিশ্বায়নের যুগে পর্যটন একটা লাভজনক অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির মাধ্যম। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতাে বাংলাদেশেও পর্যটন শিল্পের যথাযথ উন্নতি ও তদারকিতে লাভজনক হিসেবে গড়ে ওঠতে পারে। পেট্রো ডলারের মতাে চিংড়ি ও পােশাক রপ্তানি, চা, চামড়া, পাট যা দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামাে ধরে রাখতে এককালে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল সে তুলনায় বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে তাদের ব্যায়িত বিদেশি কারেন্সি অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

পর্যটন আজকের বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং অতিদ্রুত সম্প্রসারণশীল শিল্প। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার হিসাব মতে, ২০০০ সালে মােট ৬২ কোটি মানুষ বিভিন্ন দেশে পর্যটনে যায়। ২০১০ সালে পর্যটকের সংখ্যা ১০০ কোটিতে উন্নীত হবে। পর্যটকগণ প্রতিবছর থাকা-খাওয়া ও সাইট সিইং বাবদ গড়ে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় করে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ২৫ কোটি ৫০ লাখ মানুষ এই খাত থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে এবং আগামী বছরগুলোতে এর সংখ্যা ৫০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। যা বিশ্বের মােট বিনিয়ােগের শতকরা ২৫% হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশও পর্যটনের এ শিল্প ও সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে। 

বাংলাদেশ পর্যটন করপােরেশন

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া পর্যটন শিল্পের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের প্রয়ােজন হয়। বাংলাদেশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতিকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে তুলে ধরে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও বেকারত্ব বিমােচনের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ২৭ নভেম্বর তারিখে জারিকৃত মহামান্য রাষ্ট্রপতির ১৪৩ নং আদেশ বলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পর্যটন সম্ভাবনাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদানের উদ্যোগ সূচিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পর্যটন করপােরেশন নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান জন্মলাভ করে এবং ১৯৭৫ সালে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশ পর্যটন করপােরেশন নবগঠিত মন্ত্রণালয়ের অধীনে নীত হয়। জাতীয় পর্যটন সংস্থা হিসেবে এই সংস্থার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে- বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ, পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থানসমূহের অবকাঠামাের উন্নয়ন, পর্যটকদের সেবা প্রদান, বিদেশে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা ও দেশের পর্যটন সম্পদের বিকাশের পাশাপাশি এ শিল্পের বিভিন্ন অঙ্গনে কর্মসংস্থানের সুযােগ সৃষ্টিসহ দেশের দারিদ্র্য বিমােচনে সহায়তা করা।

শ্রেণীভিত্তিক বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণ

বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণগুলােকে নিম্নরুপে ভাগ করা যায়। যথাঃ 

ক) প্রাকৃতিক বা বিনােদনমূলক পর্যটনঃ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভােগ , শহরের যান্ত্রিক জীবনের বাইরে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসা কিংবা হঠাৎ করে কোনাে নতুন পরিবেশের ছোঁয়া পাবার জন্য মানুষ ছুটে যায় প্রকৃতির কাছে। এ ধরনের নয়নকাড়া প্রাকৃতিক অবস্থান বাংলাদেশে প্রচুর রয়েছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনােরম সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চল ও চা বাগান, তামাবিল, জাফলং, রাঙামাটির নয়নাভিরাম কৃত্রিম হ্রদ, সুন্দরবনসহ বিভিন্ন বনাপল। এছাড়াও রয়েছে উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চল, বর্ণাঢ্য উপজাতীয় ও গ্রামীণ জীবনধারা।

গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক দৃশের একটি ছবি
গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক দৃশের একটি ছবি

খ) রােমাঞ্চকর ভ্রমণ এবং পরিবেশভিত্তিক পর্যটনঃ রােমাঞ্চকর ও পরিবেশভিত্তিক পর্যটনের অনেক ক্ষেত্র রয়েছে বাংলাদেশে। সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যপ্রাণী এবং উদ্ভিতসম্ভার দেখা যায়। রাঙ্গামাটির নৌবিহার, মৎস্য শিকার, জলক্রীড়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ট্রেকিং, হাইকিং ইত্যাদির সুযােগ রয়েছে। সাগরের বুক চিরে অপরূপ দ্বীপ সেন্টমার্টিন। পর্যটক আকর্ষণের এমনি অনেক সুযােগ আছে আমাদের এই বাংলাদেশে।

গ) সাংস্কৃতিক পর্যটনঃ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন সাংস্কৃতিক পর্যটনের পর্যায়ভুক্ত। মহাস্থানগড়, ময়নামতি, পাহাড়পুর, ঢাকার লালবাগের দুর্গ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় জাদুঘর, সােনারগাঁও জাদুঘর, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, নাটোর ও পুঠিয়ার রাজবাড়ি এবং এমনি আরাে অনেক সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্মিক নিদর্শন রয়েছে বাংলাদেশে। 

ঘ) ধর্মীয় পর্যটনঃ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লােকেরা মূলত ধর্মীয় অনুভূতি থেকেই কিছু কিছু স্থানে ভ্রমণ করে। ঐতিহাসিক ধর্মীয় সাংস্কৃতিক আকর্ষণীয় স্থান বাংলাদেশে বিস্তর। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মাজার, দরগাহসহ বিভিন্ন নিদর্শন ছড়িয়ে আছে সারাদেশময়। এসব আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, ঢাকার সাতগম্বুজ মসজিদ, রাজশাহীর শাহ মখদুমের মাজার, পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার, মহাস্থানগড়, নবাবগঞ্জের সােনা মসজিদ, ঢাকেশ্বরী মন্দির, আর্মেনিয়ান চার্চ’, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বােস্তামীর দরগাহ, সিলেটের হজরত শাহজালারের দরগা, কক্সবাজারের রামু মন্দির, রাজশাহীর তাহেরপুর রাজবাড়ি প্রভৃতি।

ঙ) নৌ পর্যটনঃ বিনােদনমূলক পর্যটনের জন্য এদেশের নদনদী আকর্ষণীয় উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে বহুকাল যাবৎ। বাংলাদেশ নদীবহুল দেশ। ২৫৭টি ছােটবড় নদনদী জালের মতাে বিস্তৃত হয়ে আছে সারাদেশময়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃত সৌন্দর্য অনেকাংশেই ফুটে ওঠে নৌভ্রমণের মাধ্যমে। এখান থেকেই অনুভব করা যায় সােনারবাংলার প্রকৃত ছবি।

নৌ পর্যটনের একটি ছবি
নৌ পর্যটনের একটি ছবি

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্প নানাভাবে অবদান রাখতে পারে। প্রথমত, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বাংলাদেশে এমনিতেই রপ্তানি কম। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কোনাে খাতই তেমন শক্তিশালী নয়। এই প্রেক্ষাপটে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলে পর্যটনের মতাে ‘অদৃশ্য রপ্তানি পণ্য’ খাতে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারে। পর্যটন করপােরেশন মুনাফা অর্জনকারী সংস্থার মধ্যে একটি। ১৯৮৩-৮৪ থেকে ২০০৩-২০০৪ পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠান সর্বমােট ৪৯৭৩.১০ লক্ষ টাকা করপূর্ব মুনাফা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ সরকার পর্যটন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযােগিতা ও সুনাম অর্জনে বিরাট অবদান রেখেছে। বাংলাদেশ ২ বছরের জন্য (২০০১-২০০৩) বিশ্ব পর্যটন সংস্থার কমিশন ফর সাউথ এশিয়ার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। বাংলাদেশ পর্যটন করপােরেশন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি পর্যটন শিল্পে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ১৯৭৪ সালে জাতীয় হােটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে। এ পর্যন্ত এখানে পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সে ২২,০০০-এর বেশি ছাত্র-ছাত্রীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশ-বিদেশ কর্মরত আছে। পর্যটন শিল্পের উন্নতির সঙ্গে যে সব ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হতে পারে সেগুলাে হলঃ

  • ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযােগ সৃষ্টি ও বেকারত্ব লাঘব,
  • প্রাকৃতিক সম্পদ উন্নয়ন,
  • কুটিরশিল্প ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়ন,
  • বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি,
  • অবকাঠামাে ও যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নয়ন,
  • বৈদেশিক বিনিয়ােগ,
  • আন্তর্জাতিক যােগাযােগ বৃদ্ধি ইত্যাদি।

শিক্ষাক্ষেত্রে ও জ্ঞানার্জনে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব

মানুষ জন্মগতভাবে সৌন্দর্যপিয়াসি। স্রষ্টার অপূর্ব সব সৃষ্টি দেখার নেশায় মানুষ ঘুরে বেড়ায় দেশ হতে দেশান্তরে। পর্যটনকে বিনােদনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপকরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধু তাই নয়, বিনােদনের সাহায্যে শিক্ষালাভের সবচেয়ে উপযােগী মাধ্যম হচ্ছে পর্যটন। পাঠ্যপুস্তকের একটি বিষয় দশবার পড়ে যে জ্ঞানার্জন করা যায় একবার স্বচক্ষে দেখেই তার চেয়ে বেশি জ্ঞানলাভ করা সম্ভব। উন্নত অনুন্নত নির্বিশেষে সব দেশেই পর্যটনকে শিক্ষার উপকরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলাে প্রতিবছর যে শিক্ষাসফরের আয়ােজন করে তা পর্যটন ছাড়া আর কিছু নয়। এছাড়া পর্যটকের লেখা ভ্রমণবৃত্তান্ত ইতিহাসের চমৎকার উপকরণ হিসেবে গণ্য। তাদের ভ্রমণবৃত্তান্ত পাঠ করে আমরা যেকোনাে জনপদের ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত হতে পারি। পর্যটন শুধু অকারণ নেশা বা বিনােদন মাধ্যম মাত্র নয়। বিশ্বের কোনাে দেশেই এখন আর পর্যটনকে শুধু বিনােদন উপকরণ হিসেবে মানতে নারাজ। বরং সব দেশেই এখন পর্যটনকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক খাত এবং জ্ঞানার্জনের অন্যতম উপায় হিসেবে বিবেচনা করছে।

আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব

সমগ্র বিশ্বের প্রায় ১১ কোটি মানুষ পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত। এ শিল্প কেবল নিজ দেশের অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করে না বরং বিশ্ব অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করে। ১৯৯১ সালের বাংলাদেশের সরকার প্রণীত পর্যটন নীতিমালায় পর্যটনকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প আশানুরূপ উন্নতি লাভ করতে পারেনি। অথচ অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা, সরকারি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদ উন্নয়ন, বৈদেশিক বিনিয়ােগ বৃদ্ধি, অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সম্প্রীতি সৃষ্টি, ভূমি উন্নয়নে সহায়তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ সূচনা সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। প্রয়ােজন সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেরও। পর্যাপ্ত বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের কাক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। 

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সমস্যা

অনেক সম্ভাবনাময় শিল্প হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ নানা কারণে পর্যটন শিল্পে আশানুরূপ অগ্রগতি সাধন করতে পারে নি। এক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলাে হল:

১. অবকাঠামােগত দুর্বলতাঃ এই খাতের অবকাঠামাে মারাত্মকভাবে দুর্বল। পরিবহন ব্যবস্থা মান্ধাতার আমলের। যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নতি সত্ত্বেও এখনও রয়েছে অনেক দুর্বলতা। রাস্তাঘাট সংকীর্ণ, অনেক জায়গায় বিপজ্জনক। প্রায়শই যানজটে অযথা সময় ও শক্তি নষ্ট হয়। পর্যাপ্ত আধুনিক হােটেল ও মােটেল নেই। পর্যটন কেন্দ্রগুলােও অবহেলিত। এগুলাের সুপরিকল্পিত আধুনিকায়ন ও শুল্কমুক্ত বিপণির অভাবও এ ক্ষেত্রে বড় বাধা। 

২. রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে বড় সমস্যা। 

৩. উন্নত সেবা ও তথ্যের অভাবঃ দক্ষ, মার্জিত জনবলের অভাব এ শিল্পে একটা বড় সমস্যা। সেই সঙ্গে রয়েছে উন্নত ও দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থার অভাব। অবশ্য বর্তমান ইন্টারনেট এর যুগে এ সমস্যা অনেকটাই দূর হয়েছে। সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত স্থানে ভ্রমণের পূর্বে সেই স্থানের ভালো খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে পূর্বেই অবহিত হতে পারছে।

৪. সামাজিক বাধাঃ বিদেশি পর্যটকদের সংস্কৃতিকে এদেশে অনেকেই সহজ ও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন না। অনেকেই তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। অনেকেই তাদের সম্পর্কে পােষণ করে নেতিবাচক মনােভাব। অনেক সময় পর্যটকরা দুষ্টলােকের পাল্লায় পড়ে ক্ষতিগ্রস্তও হয়। এগুলােও এ শিল্পের বিকাশে সমস্যা হয়ে আছে। 

৫. প্রচারের অভাবঃ আজকে আমরা বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, বিবিসি, সিএনএন, ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফির মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যসহ প্রাকৃতিক রূপ অবলােকন করে থাকি। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের তেমন কোনাে প্রচার নেই বললেই চলে। প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের কথা তুলে ধরার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

৬. নিরাপত্তার অভাবঃ অস্থিতিশীলতা, চুরি, ছিনতাই, হত্যা, রাহাজানি, সহিংসতা, থেকে পর্যটকদের রক্ষা করতে হবে। পর্যটকদের দিতে হবে নির্বিঘ্নে চলাফেরার নিশ্চয়তা। 

পর্যটন শিল্প বিকাশে করণীয়

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এই শিল্পের বিকাশে (১) সরকারি পৃষ্ঠপােষকতায় পর্যটন স্পটগুলােকে বেশি আকর্ষণীয় করে তােলা; (২) যাতায়াতের সুষ্ঠু ব্যবস্থা তথা বিমান, নৌ ও সড়ক যােগাযােগের ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন; (৩) নিরাপদ ভ্রমণের যাবতীয় ব্যবস্থাকরণ; (৪) দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া সচেষ্ট হতে হবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিরসনে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায়। পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য চাই প্রয়ােজনীয় অবকাঠামােগত উন্নয়ন ও সংস্কার। চাই স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা। আকর্ষণীয় এলাকাগুলাের পরিকল্পিত নান্দনিক উন্নয়ন যেমন প্রয়ােজন তেমনি প্রয়ােজন পর্যটন-কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ। পর্যটন সংক্রান্ত নানা বিষয়ে প্রয়ােজন তথ্যপূর্ণ আকর্ষণীয় প্রচার। এই শিল্পের বিকাশের জন্য পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে পর্যটকদের নিরাপত্তা। বিভিন্ন দেশের মতাে পর্যটকদের বাড়তি কিছু সুবিধা দিতে হবে। সৈকতে রাখতে হবে বিভিন্ন বিনােদনের ব্যবস্থা, ব্যবহার করতে হবে আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি। প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থানসহ অন্যান্য দৃষ্টিনন্দন স্থানকে পর্যটনের আওতায় এনে সমৃদ্ধ করতে হবে।

পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে পর্যটন সংস্থার দায়িত্ব

বাংলাদেশ সরকার পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে যথেষ্ট আন্তরিক, সচেতন ও তৎপর। এ লক্ষ্যে সরকার বাংলাদেশ পর্যটন শিল্প সংস্থার হাতে দেশের পর্যটন শিল্পের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বাংলাদেশ পর্যটন শিল্প সংস্থা পর্যটন শিল্পকে আধুনিকায়ন করতে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইতােমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটন শিল্প সংস্থার কতকগুলাে আঞ্চলিক অফিস স্থাপন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কতকগুলাে আধুনিক অভিজাত শ্রেণির ডাকবাংলাে স্থাপিত হয়েছে। কাপ্তাই ও রাঙামাটিতে কতকগুলাে সুন্দর ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। দেশি ও বিদেশি পর্যটকেরা এগুলাে ব্যবহার করে থাকেন। তাছাড়া কাপ্তাই ও রাঙামাটিতে হাউসবােট, স্পিডবােট ইত্যাদি প্রমােদতরিরও ব্যবস্থা করেছে।

বাংলাদেশের পর্যটন স্থান

বাংলাদেশে অসংখ্য পর্যটন স্থান রয়েছে। নিচে বাংলাদেশের কয়েকটি উল্লেখযােগ্য পর্যটন স্থানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলঃ

কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতঃ বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকতের অবস্থান আমাদের বাংলাদেশের কক্সবাজারে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলােমিটার। আরও রয়েছে দক্ষিণ অঞ্চলের কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। যেখানে অবস্থান করে অবলােকন করা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। যা খুবই বিরল। 

সেন্টমার্টিনঃ  আমাদের আছে জগদ্বিখ্যাত প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রবাল দ্বীপের নামই সেন্টমার্টিন। নারিকেল বীথিতে ঘেরা যার সৈকত। এখানে রয়েছে পর্যটন শিল্পে অপার সম্ভাবনা। 

রাঙামাটি ও বান্দরবানঃ পাহাড়-পর্বত ঘেরা বান্দরবান, রাঙামাটির সবুজ বনানীতে অপরূপ সৌন্দর্য সহসাই মনকে উচাটন করে দেয়। ছােট-বড় পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদী, ঝরনা আর হ্রদের অপার নান্দনিকতা। যে-কোনাে মানুষকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। পাহাড়ি উপজাতিদের কৃষ্টি সংস্কৃতি জীবনযাত্রার বর্নাঢ্যতা মুগ্ধ করে পর্যটন প্রিয়দের। 

সুন্দরবনঃ এই বাংলাদেশেই অবস্থিত পৃথিবীর বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন যার নাম সুন্দরবন। খাল, নদী, সাগর বেষ্টিত সুন্দরবনের জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘ। যে বাঘ ভুবন বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার নামে অভিহিত। সুন্দরবন ছাড়া এই বাঘ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এছাড়া আছে ঝাঁকে ঝাঁকে চিত্রল হরিণ, বানর, শূকর, বনমােরগ, অজগরসহ নানা প্রকার বন্যপ্রাণী। সুন্দরবনে অবস্থানকালে পর্যটকদের ঘুম ভাঙাবে অগুনতি পাখির কল-কাকলী যা একজন পর্যটককে স্বপ্নিল আবেশে মুগ্ধ করতে পারে।

চা বাগান ও জলপ্রপাতঃ সিলেট অঞ্চলের চা বাগানগুলােও বেশ সৌন্দর্যমণ্ডিত, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। জাফলংয়ের জলপ্রপাত, ছাতকের পাথর কেয়ারি নয়নভােলােনাে স্থান। 

এছাড়া তামাবিল, চট্টগ্রামে ফয়েস লেক, যমুনা সেতু, মহাস্থানগড়, রামসাগর, সােনারগাঁও, লালবাগ দুর্গ, কান্তজীর মন্দির ইত্যাদি পর্যটনের স্থান হিসেবে বেশ সমাদৃত।

পর্যটকদের সুযােগ-সুবিধা

বাংলাদেশ পর্যটন শিল্প সংস্থার অধীনে কক্সবাজার, রাঙামাটি, কুমিল্লা, কুয়াকাটা, রংপুর, সিলেট প্রভৃতি স্থানে ছােট-বড় অভিজাত শ্রেণির হােটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্রীড়াকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসসহ নানা ধরনের যানবাহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের নিরাপত্তার জন্য সৈকত পুলিশের ব্যবস্থাও আছে। রাঙামাটি ও কাপ্তাইয়ে হাউসবােট ও স্পিডবােটের ব্যবস্থা রয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার জন্য বাংলাদেশ পর্যটন শিল্প সংস্থা ট্যুরিস্ট গাইড-এর ব্যবস্থা করেছে। ব্যাপক সুবিধার পাশাপাশি পর্যটনের বেশ কিছু অসুবিধাও রয়েছে। পর্যটনকে একটি শক্তিশালী মাধ্যমে হিসেবে গড়ে তুলতে হলে যে বিষয়টিকে প্রথমে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে তা হলাে পর্যটকদের চাহিদা ও নিরাপত্তা। বিশ্বের নানা দেশের পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য আমাদের দেশের দর্শনীয় এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলােকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তুলতে হবে। বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দর্শনীয় ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলােকে সংস্কারের মাধ্যমে আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে হবে। আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থানগুলাের সাথে যােগাযােগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করতে হবে। আর সেগুলাে সম্ভব হলে বিদেশি পর্যটকদের আগমন বেড়ে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের পথ সুগম হবে।

উপসংহার

পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে আরাে উন্নত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়ােজন। ৭ম শতকে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন : “A sleeping beauty emerging from mists and water.” এই উচ্ছ্বসিত প্রশংসাকে সর্বদা ধরে রাখার মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশের দায়িত্ব আমাদের। সরকারের পাশাপাশি আমরা বেসরকারি উদ্যোগে বিকাশ ঘটাতে পারি পর্যটন শিল্পের। আমরা সম্মিলিতভাবে যদি প্রচেষ্টা চালাই তাহলে অচিরেই পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে স্থান করে নিবে। আসুন, আমরা সকলে মিলে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে অনিবার ভালােবাসায় ভরিয়ে তুলি। আর জগদ্বাসীকে আপন করে গ্রহণ করি নিজের দেশে পরম আতিথেয়তায়।

Rimon

This is RIMON Proud owner of this blog. An employee by profession but proud to introduce myself as a blogger. I like to write on the blog. Moreover, I've a lot of interest in web design. I want to see myself as a successful blogger and SEO expert.

মন্তব্য করুন

Related Articles

Back to top button