বাংলা রচনা

দুর্নীতি উন্নয়নের অন্তরায় । রচনা । SSC HSC

4.8/5 - (20 votes)

দুর্নীতি উন্নয়নের অন্তরায় রচনা : প্রিয় শিক্ষার্থী, তোমরা অনেকেই দুর্নীতি উন্নয়নের অন্তরায় রচনাটির জন্য অনুরোধ করেছিলে। তাই বিভিন্ন বই থেকে পয়েন্ট সংগ্রহ করে রচনাটি তোমাদের মাঝে উপস্থাপন করা হল।

ভূমিকা

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়া সর্বগ্রাসী দুর্নীতির ভয়াল কালো থাবায় বিপন্ন আজ মানবসভ্যতা। এ সর্বনাশা সামাজিক ব্যাধির মরণ ছোবলে বর্তমান সমাজ জর্জরিত। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি। দুর্নীতির করালগ্রাসে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্রমশ হয়ে উঠছে অনিশ্চিত ও অনুজ্জ্বল। তাই বিশেষজ্ঞরা দুর্নীতিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ।

দুর্নীতি কি?

দুর্নীতি একটি ব্যাপক ও জটিল বিষয়। দুর্নীতির গতি-প্রকৃতি বহুমুখী এবং বিচিত্র বলে এর সংজ্ঞা নিরূপণ জটিল। দুর্নীতি সমাজের প্রচলিত নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিপন্থী বিশেষ ধরনের অপরাধমূলক আচরণ। দুর্নীতির সাথে পেশা, ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা, পদবি প্রভৃতির অপব্যবহার সংশ্লিষ্ট। আভিধানিক অর্থে দুর্নীতি হলো ঘুষ বা অনুগ্রহ দ্বারা জনকর্তব্য সম্পাদনে একাগ্রতার বিকৃতি বা ধ্বংস । নৈতিক প্রেক্ষাপটে বলা যায়-নীতিবিচ্যুত হওয়া বা কোনো গুণ ও পবিত্রতার অবমাননাই হলো দুর্নীতি। আবার প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়-ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ কিংবা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বা অন্য কাউকে অবৈধ সুযোগ- সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজের খেয়াল- খুশিমতো সরকারি ক্ষমতা বা পদমর্যাদার অপব্যবহার করে বা টাকা-পয়সা এবং বস্তুগত উৎকোচাদির মাধ্যমে অন্যায় কোনো কাজ করে অথবা ন্যায়সঙ্গত কাজ করা থেকে বিরত থাকে তাহলে তার এরূপ কার্যকলাপই দুর্নীতি।

বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা

বর্তমানে বাংলাদেশে সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ জীবনযাত্রার প্রায় সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি এক মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে। এ কালব্যাধির করালগ্রাসে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্রমশ হয়ে উঠছে অনিশ্চিত। বর্তমান সমাজে দুর্নীতির অবস্থান এমনই শক্তিশালী যে, দেশের সাধারণ মানুষ দুর্নীতির কাছে অসহায় হয়ে একে তাদের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে ৮ হাজার মামলা ঝুলে আছে শুধু দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে। গত ৩৫ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ পরপর ছয়বার বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে দুর্নীতির জন্য। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে ২০০১, ২০০২, ২০০৩, ২০০৪, ২০০৫ ও ২০০৬- এ ছয় বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরপর ছয়বার শীর্ষ দুর্নীতিবাজ জাতি হিসেবে এ পরিচিতি সারা বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি

রাজনৈতিক দলগুলো দেশের মূল চালিকাশক্তি। অথচ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই বর্তমানে ব্যাপকহারে দুর্নীতি চলছে। জনগণের সাথে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বরখেলাপ, ক্ষমতায় থাকাকালে নিজ পদ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাকে অন্যায়ভাবে নিজের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু- বান্ধব ও নিজ দলীয় কর্মী-সমর্থকদের স্বার্থে কাজে লাগানো, তাদেরকে নির্মাণকাজের ঠিকাদারি বা হাট-বাজারের ইজারা প্রদান এবং বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স দেওয়া, ব্যবসায়ী মহলসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার কাছ থেকে কমিশন গ্রহণ ও চাঁদা আদায় এবং বিনিময়ে তাদের বিভিন্ন অন্যায় সুবিধা প্রদান, সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাৎসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দুর্নীতি বর্তমানে এ দেশে স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত হয়েছে।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি

বর্তমানে বাংলাদেশের কোনো সরকারি দপ্তর, বিভাগই দুর্নীতিমুক্ত নয়। ঘুষ বা উৎকোচ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অপচয় ও চুরি ছাড়াও ক্ষমতার অপব্যবহার, কাজে ফাঁকি দেওয়া, স্বজনপ্রীতি, সরকারি সুযোগ- সুবিধার অপব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে প্রশাসনে ব্যাপকহারে দুর্নীতি হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি

ব্যবসায়ী মহল কর্তৃক মজুদদারির মাধ্যমে দ্রব্যবাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়, বিভিন্ন অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা, চোরাকারবার, খাদ্যে ভেজাল দেওয়া, নকল পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়, ওজনে কম দেওয়া, সরকারি রেশনে কারচুপি করা, কর, শুল্ক, খাজনা ইত্যাদি ফাঁকি দেওয়াসহ এ ধরনের অর্থনৈতিক দুর্নীতি বর্তমানে বাংলাদেশকে গ্রাস করে ফেলছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি

পরীক্ষায় ব্যাপক নকল প্রবণতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়; যেমন: পরীক্ষায় পাস করার পরেও অতিরিক্ত সেশন ফি নিয়ে নতুন করে ভর্তি করানোর রীতি, ক্লাসে ভালোভাবে না পড়িয়ে প্রাইভেট, টিউশনি ও কোচিং সেন্টারে পাঠদান, নিয়মিত ক্লাসে না আসা, দলীয় ভিত্তিতে অযোগ্য লোকদের বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়াসহ এ ধরনের অসংখ্য দুর্নীতির কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগতমানে চরম অবনতি ঘটেছে।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে দুর্নীতি

এ দেশে ধর্মকে কেন্দ্র করেও নানা রকমের দুর্নীতি চলছে। জনসাধারণের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা, স্বার্থসিদ্ধি, অর্থ উপার্জন ও জনস্বার্থবিরোধী কাজ ধর্মীয় দুর্নীতির পর্যায়ভুক্ত। বিভিন্ন ধরনের ধর্মব্যবসা, রোগমুক্তি ও মনোবাসনা পূরণে ধর্মের দোহাই দিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের সাথে ধোঁকাবাজি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে কাজে লাগানোও ধর্মীয় দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে।

বেসরকারি খাতে দুর্নীতি

শুধু সরকারি খাতে নয়, বেসরকারি খাতেও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার নামে সরকারি সুবিধা ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে সে টাকা বিলাস-ব্যসন বা অন্য কাজে ব্যবহার এবং বিদেশি ব্যাংকে জমা করা, ব্যাংক ঋণ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ না করা, কর ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া, শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি ইত্যাদি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ঋণখেলাপি বর্তমানে বাংলাদেশে রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে ।

উপসংহার

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক জীবনের সর্বাংশ আজ দুর্নীতির কবলে নিমজ্জিত। দুর্নীতির কালো হাত সমাজ জীবনের সকল দিককে গ্রাস করেছে। দুর্নীতিই বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। দুর্নীতিই আমাদের সকল অর্জন এবং জাতীয় উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। তাই জাতীয় উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে একটি সমৃদ্ধশালী ও মর্যাদাবান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য আমাদেরকে দুর্নীতি নামক এ সর্বনাশা ও সর্বগ্রাসী সামাজিক ব্যাধির মূলোৎপাটনে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে।

Rimon

This is RIMON Proud owner of this blog. An employee by profession but proud to introduce myself as a blogger. I like to write on the blog. Moreover, I've a lot of interest in web design. I want to see myself as a successful blogger and SEO expert.

মন্তব্য করুন

Related Articles

Back to top button